মধ্যপাড়ার খনির পাথর অবিক্রিত, সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা

দেশের উত্তর অঞ্চলের দিনাজপুরের একমাত্র গ্রানাইট পাথর খনি মধ্যপাড়ায়।মধ্যপাড়া পাথরখনির পাথর অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সরকারি ভাবে পাথর বিক্রিরউদ্দ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক নির্মাণ কাজে মধ্যপাড়ার পাথরব্যবহারে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ভারত থেকে চড়াদামে পাথর আমদানি বন্ধকরে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। লাভবান হবে সরকার ওঠিকাদার।
দেশের বড়বড় মেগা প্রকল্পেমধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করলেমজমুদ ও টেকশই হবে।যা হাজার বছরেও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। দিনাজপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনিতে খনির ইয়ার্ডে বিপুলপরিমাণ পাথরের মজুদ থাকলেও বিক্রিতেভাটা পড়েছে। অর্থনৈতিক কারণে সরকারের মেগা প্রকল্পগুলিতে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায়মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি কমেগেছে। এ কারণে খনিকর্তৃপক্ষ অর্থসংকটে পড়েছে। ঋণ করে ঠিকাদারেরবিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
মধ্যপাড়া খনি ইয়ার্ডে প্রায়সাড়ে ৯ লাখ মেট্রিকটন পাথর মজুদ আছে।এর মধ্যে ৫ লাখ ২৫হাজার টন ব্লাস্ট পাথররেলপথে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য এবং ২লাখ ২২ হাজার টনবোল্ডার নদী শাসনের কাজে ব্যবহৃত হওয়ারজন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ইয়ার্ডে।মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি কমেযাওয়ার ফলে খনি কর্তৃপক্ষবিপাকে পড়েছে। দ্রুত এসব পাথর বিক্রিনা হলে খনির উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যেতেপারে বলে ধারনা করাহচ্ছে।
এদিকে, দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ মধ্যপাড়া খনি থেকে উৎপাদিতপাথরের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশপ্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), যুক্তরাজ্যের কিউইডি স্বাধীন টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড, এবং সিঙ্গাপুরের অ্যাডমেটেরিয়ালসটেকনোলজিস পিটিই লিমিটেডের তত্বাবধানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত এবং প্রতিবেশী দেশথেকে আমদানীকৃত পাথরের তুলনায় মধ্যপাড়া খনি থেকে উৎপাদিতপাথরের গুণমান অনেক উন্নত যাপৃথিবীর অন্য কোথায় নেই।
দেশে পাথরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬লাখ মেট্রিক টন হলেও এরসিংহভাগ আমদানী করা হয় ভারতও ভূটান থেকে। আন্তর্জাতিক মানের এবং কম দামেপাথর থাকা সত্ত্বেও, নানা কারণে পাথরব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যপাড়া পাথর ব্যবহারে অনীহাপ্রকাশ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্রের দরেমধ্যপাড়া পাথরের ব্যবহারের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা পালন করাহচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকেমধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারেরজন্য তাগাদাদিলে খনির পাথর বিক্রিরচাহিদা বেড়ে যেতে পারে।এ জন্য সরকারের উচিৎ খনিটির প্রতি নজর দেওয়া।
এ বিষয়ে খনির কর্মকর্তারা জানান, আমদানী পাথরের উপর শুল্ক বৃদ্ধিএবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু বৃদ্ধি প্রয়োজন। তারা মনে করেন, এতে পাথরের বিক্রিতে সুবিধা হবে এবং দেশের একমাত্রভূগর্ভস্থ পাথর খনিটিকেও বাঁচিয়েরাখা যাবে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে ৫-২০ (৩-৪) মিমি, ২০-৪০ মিমি, ৪০-৬০ মিমি (ব্লাস্ট), ৬০-৮০ মিমি ওবোল্ডার— এই ৫টি সাইজেপাথর উৎপাদিত হচ্ছে। তবে রেলপথে ব্যবহৃত৫ লাখ ২৫ হাজারটন ব্লাস্ট পাথর এবং নদীশাসনের কাজে ব্যবহৃত ২ লাখ ২২হাজার টন বোল্ডারের বিক্রিকমে গেছে।’
তিনি জানান, মধ্যপাড়ারপাথর যে দামে বিক্রিহচ্ছে ভারত সে ভাবেদিতে পারবে না। আমাদের উৎপাদিত পাথর অত্যন্ত উন্নত। সরকারি সমস্ত উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করলেএবং সরকার দৃষ্টি দিলে
বাংলাদেশের মধ্যে খনিটি রেকর্ড পরিমান উৎপাদন আরও বাড়াবে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৫মে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিবাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। উৎপাদন শুরুর পর থেকে নানাপ্রতিকুলতার কারণে পেট্রোবাংলা প্রতিদিন তিন শিফটে ৫ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতেএক শিফটে ৭-৮’শমেট্রিক টনের বেশি পাথর উত্তোলন করতে পারেনি। এরফলে ২০১৩ সালের জুনপর্যন্ত ৬ বছরে খনিটিলোকসান দিয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা।
২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৬বছরের জন্য খনির উৎপাদনও রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় একমাত্রমাইনিং কাজে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেড নিয়ে গঠিত জার্মানিয়াট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামকে (জিটিসি)। বর্তমানে খনিভূগর্ভে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক মাইনিং ইক্যুইপমেন্ট বসানো হয়েছে। ইউরোপিয়ান সুদক্ষ প্রকৌশলী দল ও দক্ষখনি শ্রমিক দিয়ে পাথর উত্তোলনকাজ চালানো হচ্ছে। পূর্ণমাত্রায় পাথর উৎপাদন করায়২০১৮- ১৯ অর্থবছর থেকে মুনাফা করেআসছে খনিটির।
জিটিসির প্রথম দফা চুক্তির মেয়াদশেষ হয় ২০২১ সালের২ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় দফা চুক্তির আওতায় ২০২১ সালের ৩সেপ্টেম্বর থেকে পাথর উৎপাদনকরছে কোম্পানিটি। দ্বিতীয় দফা চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ৬ বছরে প্রায়১ হাজার ২৮০ কোটি টাকার বিনিময়ে ৮৮ লাখ ৬০হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলনকরে দিবে। জিটিসি সুষ্ঠুভাবে খনি খনিটি পরিচালনাকরছে। খনিটির উৎপাদিত পাথর বিক্রি বাড়লেসরকারের প্রচুর রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ভারত ভূটান থেকেদেশীয় অর্থ ব্যায় করেপাথর আমদানি বন্ধ করলে বৈদেশিকমুদ্রা সাশ্রয় হবে। খনির শ্রমিকেরালাভবান হবে।
কোম্পানি তাদের অথনৈতিক দিকে থেকে এগিয়েযাবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ ভাগ উন্নয়ন কাজে দেশীয় পাথরব্যবহার করা হচ্ছে না।যার কারণে মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি কমেছে। সরকারীভাবে পদক্ষেপ নিলে মধ্যপাড়ার পাথরসরকারের উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করাহলে দেশের অর্থনৈতিতে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের খনিটির প্রতি নেক দৃষ্টি দেওয়াএকান্ত প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/মো.আ.