ফেলে দোওয়া নারিকেল গাছের পাতাতেই কোটি টাকার বাণিজ্য

নারিকেল গাছের ফেলে দেওয়া পাতা এখন জীবিকার হাতিয়ার। পাতা নিয়েই ঘুরছে কোটি টাকার বাণিজ্য। একসময় যে পাতা ছিল গাছের নিচে পড়ে থাকা সাধারন আবর্জনা, সেই নারিকেল পাতার শলা এখন হয়ে উঠেছে জীবিকার অন্যতম অবলম্বন।
পিরোজপুরের নাজিরপুর, স্বরুপকাঠ উপজেলাসহ সকল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নারিকেল পাতার শলা সংগ্রহ, শুকানো, বাছাই, বাঁধাই ও বাজারজাত করে গড়ে উঠেছে ঝাড়ুর শলা তৈরির এক নীরব অর্থনীতি। ঘরে ঘরে তৈরি হওয়া এসব শলা স্থানীয় বাজার পেরিয়ে যাচ্ছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে।দেখতে সাধারন মনে হলেও শলা দিয়ে তৈরী ঝাড়ু শিল্পের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ।
ভোর থেকে শুরু হয় শলা সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজ। কেউ নারিকেল গাছের শুকনো পাতা থেকে শলা আলাদা করেন, কেউ সেগুলো পরিষ্কার ও সমান করেন। এরপর নির্দিষ্ট মাপে সাজিয়ে বাঁধাই করে ঘরের সামনে বসেই চলে যায় পাইকারদের হাতে।
নাজিরপুরের গ্রামীণ জনপদে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন নারী-পুরুষ উভয়েই। সংসারের কাজের ফাঁকে নারীরা শলা তৈরির কাজ করে বাড়তি আয়ও করছেন। তাই অনেক পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যম।
ঝাড়ুর শলা তৈরির বড় সুবিধা হলো এটায বিশেষ ধরনের যন্ত্রপাতি বা অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করেই ঘরে বসে কাজ করা যায়। ফলে স্বল্প পুঁজিতে এই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
একজন শলা শিল্পের প্রথমে নারিকেল পাতার শলা সংগ্রহ করেন। এরপর শলা শুকিয়ে ভালো ও খারাপ অংশ আলাদা করেন। মজবুত ও পরিষ্কার শলাগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণে একত্র করে শক্ত করে বেঁধে রাখেন।
নাজিরপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের বিশেষ অংশগ্রহণ। বাড়ির কাজের পাশাপাশি অনেকে অবসর সময়ে ঝাড়ুর শলা পরিষ্কার, বাছাই ও বাঁধাইয়ের কাজ করেন গ্রামীণ নারীরা।ফলে পরিবারের পুরুষ সদস্য বাইরে অন্য কাজে থাকলেও নারীরা নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক পরিবারের কাছে এটি ছোট হলেও নিয়মিত আয়ের একটি উৎস।
নাজিরপুরের ভীমকাঠী গ্রামের আয়েশা বেগম বলেন, বাড়ির কাজের ফাঁকে শলা বানাই। প্রতিদিন অনেকগুলো শলা তৈরি করতে পারলে সংসার খরচে সহযোগিতা করা যায়। সেই সাথে নিজের ও বাচ্চাদের জন্য বাড়তি আয়ও হয়। ঘরে বসে কাজ করা যায় বলেই আমাদের জন্য কাজটি সুবিধার।
নাজিরপুরে তৈরি শলার বড় একটি অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও আরেকটি অংশ পাইকারদের মাধ্যমে জেলার বাইরে যাচ্ছে।
এভাবে নারিকেল গাছের শলাকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরের নাজিরপুরে তৈরি হয়েছে কয়েক ধাপের বাণিজ্যিক চক্র। কাঁচামাল সংগ্রহকারী, কারিগর, স্থানীয় ব্যবসায়ী,পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা। প্রত্যেকেই এই শলা শিল্প থেকে কোনো না কোনোভাবে আয় করছেন।
কোটি টাকার সম্ভাবনাময় এই শিল্পে জেলার বিভিন্ন গ্রামের ছোট ছোট ঘর ও আঙিনায় ছড়িয়ে থাকা ঝাড়ু তৈরির কাজকে বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারন মনে হলেও কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা, প্রতিদিনের উৎপাদন, স্থানীয় ও বাইরের বাজারে সরবরাহ ও পাইকারি লেনদেন এর হিসাব করলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, সঠিকভাবে হিসাব করা গেলে এই শিল্পের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমান আনুমানিক প্রায় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তারা। তবে এর সুনির্দিষ্ট পরিমান জানতে হলে উৎপাদন, পাইকারি বিক্রি ও বাজারজাতকরণের ওপর একটি সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন।
সম্ভাবনাময় এই শলা শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের রয়েছে নানাবিধ অভিযোগ ও সংকট। কাঁচামালের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, শ্রমের মূল্য, পাইকারি বাজারে দামের ওঠানামা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় প্রত্যাশিত লাভ তারা পায়না।
নজিরপুরে শলা ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও কারিগররা জানান, তারা শ্রম দিয়ে শলা তৈরি করলেও বাজারজাত করারনের জন্য লাভের বড় একটি অংশ চলে যায় পরিবহনে।
অভিযোগ করে তারা বলেন, কখনো সরকারি নূন্যতম সহযোগিতা বা ঋণ পান না। সরকারি সহযোগিতা বা ঋণ পেলে তারা এ ব্যবসাকে আরও বড় করতে পারতো।
পিরোজপুরের এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে এটি শুধু স্থানীয় কর্মসংস্থান নয়, বড় ক্ষুদ্র শিল্পখাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কারিগরদের প্রশিক্ষন সহজ শর্তে ঋন, কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যবস্থা, মানসম্মত প্যাকেজিং, সরাসরি দেশে-বিদেশে পাইকারি বাজারের সঙ্গে সংযোগ ও অনলাইন বিপননের সুযোগ তৈরি করা গেলে শলার ঝাড়ু শিল্পের পরিধি আরও বৃহৎ হবে।
শলা শিল্পে সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই পণ্যকে ব্র্যান্ডিং করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করা গেলে এই শিল্পের মূল্য আরও বাড়ানো সম্ভব। এমনকি পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক পণ্য হিসেবে এসব শলার আলাদা বাজারও তৈরি করা যেতে পারে।
ভোরের আকাশ/আ.র