চরফ্যাশনে ৩৩ ইটভাটার ১৭টিই অবৈধ, হুমকিতে বেড়িবাঁধ-কৃষি-জনস্বাস্থ্য

ভোলার চরফ্যাশনে ইটভাটার বিস্তার ঘিরে পরিবেশদূষণ, কৃষির ক্ষতি ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর সঙ্গে নতুন করে দেখা দিয়েছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষার অন্যতম অবলম্বন বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বেড়িবাঁধসংলগ্ন একাধিক ইটভাটার জন্য ড্রেজার দিয়ে বাঁধের ঢাল ও নদীতীর থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। এতে বাঁধের সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে ব্লক ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলায় ৩৩টি ইটভাটার মধ্যে ১৭টির বৈধ কোনো অনুমোদন নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব ভাটার কয়েকটিতে ড্রাম চিমনি ব্যবহার ও কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে কৃষিজমি, গাছপালা ও বসতবাড়ির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে, মেঘনা নদীর তীরবর্তী বেতুয়া প্রশান্তি পার্কের প্রবেশমুখে অন্তত ছয়টি ইটভাটা থাকায় পর্যটন এলাকার পরিবেশ ও সৌন্দর্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু অভিযান ও জরিমানা নয়, অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ, বেড়িবাঁধের মাটি কাটা প্রতিরোধ এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও কয়েকটি ভাটা কিছুদিন পর পুনরায় চালু হয়। ফলে অনিয়ম বন্ধে নিয়মিত তদারকি ও স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
চরফ্যাশনের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় একাধিক ইটভাটার জন্য ড্রেজার দিয়ে বাঁধের ঢাল ও নদীতীর থেকে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব মাটি ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জনপদের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এটি বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবন-সম্পদ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কবচ। বাঁধের ঢাল বা নদীতীর থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়া হলে এর স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সুরক্ষার জন্য বসানো ব্লকের নিচের মাটি সরে গেলে ব্লক ধসে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সামরাজ মৎস্য ঘাট এলাকার বাসিন্দা মীর ফয়সাল আলম বলেন, ইটভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে বেতুয়া ও সামরাজ এলাকার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন নদীতীরের মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে সরকারি অর্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর সম্ভাব্য ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। তাই প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকদের প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মাটি কাটা বন্ধ ও অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এছাড়াও চরফ্যাশনের আসলামপুর ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীরঘেঁষা বেতুয়া প্রশান্তি পার্ক স্থানীয় ও দূরদূরান্তের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ প্রকৃতি ও নিরিবিলি পরিবেশ এই পর্যটনকেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ। অথচ পার্কের প্রবেশমুখের আশপাশেই গড়ে উঠেছে অন্তত ছয়টি ইটভাটা।
পর্যটক মেহরুন নিছা চমক বলেন, “একটি পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশপথই দর্শনার্থীদের কাছে এলাকার প্রথম পরিচয় তুলে ধরে। সেখানে ধোঁয়া, ধুলাবালি ও ভারী ট্রাকের ভিড় থাকলে পুরো এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেতুয়া প্রশান্তি পার্কের প্রবেশপথ পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
দক্ষিণ আইচা এলাকার কৃষক রাজিব শিকদার বলেন, প্রায় দুই একর জমিতে রবি শস্য আবাদ করেছি। কিন্তু পাশের ইটভাটার কারণে গাছের বৃদ্ধি ভালো হচ্ছে না। এতে ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কৃষকেরা খরচ করে ফসল ফলান, অথচ দূষণের কারণে ক্ষতির মুখে পড়লে সেই লোকসান পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। আমরা চাই, কৃষিজমি ও পরিবেশের ক্ষতি করে এমন ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
দুলারহাট এলাকার বাসিন্দা মনির জমাদার জানান, তাঁর বাড়ির পাশে ‘ঢাকা ব্রিকস’ নামে একটি ইটভাটা রয়েছে। সেখানে কাঠ পোড়ানো হয় বলে তাঁর অভিযোগ। ভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয় বল নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয় বলে জানান তিনি।
চরফ্যাশন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা বিশেষভাবে জরুরি। জনবসতির কাছাকাছি দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই প্রয়োজন।
অবৈধ তালিকায় থাকা তেঁতুলিয়া ব্রিকসের মালিক মো. মোশারেফ জানান, প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছেন, তবে এখনো অনুমোদন পাননি। এর জন্য প্রতিবছর ভাটায় অভিযান চালানো হয় এবং জরিমানাও দিতে হয়।
অনুমোদন না পাওয়ার পরও ভাটা পরিচালনার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
আইন প্রয়োগে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও অনুমোদনের শর্ত অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু চরফ্যাশনে অনুমোদনহীন ভাটা, ড্রাম চিমনি ব্যবহার, কাঠ পোড়ানো এবং বেড়িবাঁধ ও নদীতীর থেকে মাটি কাটার অভিযোগ ঘিরে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন,চরফ্যাশনের অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের বিষয়গুলো যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, “ইটভাটাগুলোর কার্যক্রমের ওপর প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন বা অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, বেড়িবাঁধের ঢাল ও নদীতীরের মাটি কাটা প্রতিরোধ, কৃষিজমি রক্ষা এবং বেতুয়া প্রশান্তি পার্কের পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।
তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচয় বিবেচনা না করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষায় বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন এলাকাবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।
ভোরের আকাশ/সু.পা