বাঞ্ছারামপুরে ফুল মেহের হত্যা
অপবাদ ও সন্দেহের ভার সইতে না পেরে মিনা বেগমের আত্মহত্যা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে বৃদ্ধা ফুল মেহের (৭৯) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের আগেই ঘটেছে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। হত্যার আগের দিন যার বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন ফুল মেহের, সেই মিনা বেগম (৪৫) চারদিন পর কীটনাশক ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুল মেহের হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই অপবাদ, সন্দেহ, সামাজিক চাপ ও নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন মিনা বেগম। তবে তার আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়, বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মিনা বেগম ওই গ্রামের চাঁন মিয়ার স্ত্রী।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৪ জুলাই) সকালে পরিবারের অগোচরে ঘরে রাখা কীটনাশক ট্যাবলেট সেবন করেন মিনা বেগম। পরে তিনি বাড়িতেই মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভোরে একই গ্রামের বাসিন্দা ফুল মেহেরের মরদেহ তার বাড়ির উঠান থেকে উদ্ধার করা হয়। তার গলায় প্লাস্টিকের রশি পেঁচানো ছিল। পরিবারের অভিযোগ, স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে মোস্তাফা কামাল বাদী হয়ে বাঞ্ছারামপুর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর আগের দিন দুপুরে ফুল মেহের মিনা বেগমের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতে যান। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই অনেকেই মিনা বেগমকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহতের স্বামী চাঁন মিয়া বলেন, 'ফুল মেহের হত্যার পর প্রতিদিনই প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এসে মিনাকে নানা প্রশ্ন করতেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই তাকে হত্যাকারী বলে কটূক্তি করতেন। এতে সে চরম মানসিক চাপে ভুগছিল। সেই চাপ থেকেই হয়তো সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।'
মিনা বেগমের মেয়ের জামাই মাইনুদ্দিন খান বলেন, 'ফুল মেহের হত্যার ঘটনায় আমার শাশুড়িকে নিয়ে এলাকায় নানা কথা হচ্ছিল। মানুষ প্রতিদিন বাড়িতে এসে তাকে অপমান করত এবং হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না জানতে চাইত। এসব তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না।'
তিনি আরও জানান, শুক্রবার (৩ জুলাই) পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্তের অংশ হিসেবে মিনা বেগম ও তার স্বামী চাঁন মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর থেকে তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো মামলার তদন্তে তথ্য সংগ্রহের জন্য কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা মানেই তিনি অপরাধী নন। তদন্তের স্বার্থেই সম্ভাব্য বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা হয়ে থাকে।
বাঞ্ছারামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, 'প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মানসিক হতাশা ও অভিমান থেকেই ওই নারী আত্মহত্যা করেছেন। তবে আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
ফুল মেহের হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। এর মধ্যেই সন্দেহ, গুঞ্জন ও সামাজিক চাপের আবহে আরেকটি প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ভোরের আকাশ/ইউএম