শান্তি-সম্প্রীতির বার্তায় মাইজভাণ্ডারে ২২তম জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিল শাহী ময়দানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২২তম আন্তর্জাতিক জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বাদ জোহর থেকে শুরু হওয়া এ নূরানী মাহফিলে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট আলেম, ওলামা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।
মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহছুফী সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.)-এর আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় এ জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) অনুষ্ঠিত হয়। পুরো আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী।
আন্তর্জাতিক এ মাহফিলে বিদেশি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাহরাইনের সুপ্রিম সুন্নি শরিয়াহ আদালতের প্রধান বিচারপতি ও ইমাম মালিক ইবনে আনাস সোসাইটির সভাপতি আল্লামা ড. ইবরাহিম আল শেখ রশিদ আল-মুরাইখী। এ ছাড়া মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক দাওয়াহ অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. জামাল ফারুক জিবরিল মাহমুদ আদ্ দাক্কাক এবং বাহরাইনের ইমাম মালিক ইবনে আনাস সোসাইটির ফিন্যান্স সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার সামির আবদুররহমান খলিফা আল ফায়েজ উপস্থিত ছিলেন।
বিদেশি অতিথিদের আরবি ও ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্য বাংলায় অনুবাদ করেন যুক্তরাজ্যের মিনিস্ট্রি অব জাস্টিসের মুসলিম চ্যাপলেইন শায়খ মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন আযহারী।
মাহফিলে আমন্ত্রিত ওয়ায়েজীন হিসেবে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলোচনা করেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চেয়ারম্যান আল্লামা কাযী মুহাম্মদ মুঈন উদ্দীন আশরাফী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ আল্লামা হাফেজ কাজী আবদুল আলিম রেজভী, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুফতি আহমদ হোসাইন আল কাদেরী, মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ ওমাইর রেজভী, মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিছ আনসারী, এমফিল গবেষক মুফতি এ. বি. এম. আমিনুর রশীদ, মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ বশির উল আলম, মাওলানা মুহাম্মদ এনাম রেযা কাদেরী ও ছিপাতলী জামেয়া গাউছিয়া মুঈনীয়া কামিল মাদরাসার আরবি প্রভাষক মাওলানা মঈন উদ্দীন খান মামুন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খান এগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দুল হক খান, ফনিক্স শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের, শাহজাদা সৈয়দ এরহাম হোসাইন ও শাহজাদা সৈয়দ মানাওয়ার হোসাইন।
মাহফিলের ছদারত ও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন ও আওলাদে রাসুল হযরত মওলানা শাহছুফী সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.)।
সভাপতির বক্তব্যে সাজ্জাদানশীন হযরত মাওলানা শাহছুফী সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর পৃথিবীতে আগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। তাঁর জীবনাদর্শ, সুন্নাহ, চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধ অনুসরণ করলেই ব্যক্তি ও সমাজজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
তিনি বলেন, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ দীর্ঘদিন ধরে সুফিবাদ ও ইসলামের শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছে। মহানবী (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আউলিয়ায়ে কেরামের প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণ করলে সমাজের অস্থিরতা, বিভেদ ও হিংসা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
বাহরাইনের সুপ্রিম সুন্নি শরিয়াহ আদালতের সাবেক প্রধান বিচারপতি আল্লামা ড. ইবরাহিম আল শেখ রশিদ আল-মুরাইখী বলেন, বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের সংকট, বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর শিক্ষা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্প্রীতির আদর্শে ফিরে যেতে হবে।
তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) শুধু আনন্দ ও ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং মহানবী (স.)-এর জীবন, কর্ম ও আদর্শ নতুন করে স্মরণ এবং তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা।
মাহফিলে বক্তব্য দেওয়া ওলামায়ে কেরাম বলেন, ইসলাম শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতির ধর্ম। ইসলামের মূল শিক্ষায় উগ্রতা, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা অন্যের প্রতি জুলুমের কোনো স্থান নেই। যুগে যুগে আউলিয়ায়ে কেরাম মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তারা যুবকদের কোরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশ, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক এ জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) উপলক্ষে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের শাহী ময়দানে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ সমবেত হন। পুরো আয়োজনজুড়ে মহানবী (স.)-এর জীবন, আদর্শ, মানবিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তাই গুরুত্ব পায়।
ভোরের আকাশ/জেআ