আগাম আলুতে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নীলফামারীর কৃষকের

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় শুরু হয়েছে আগাম আলু চাষ। আমন ও আউশ ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে দ্রুত আলু রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঝুঁকি নিয়ে আগাম জাতের আলু চাষে নেমেছেন তারা। গত মৌসুমের লোকসান পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশাও রয়েছে অনেক কৃষকের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন মাঠে চলছে জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ ও আলুর বীজ রোপণের কাজ। পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ রোপণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে বাড়ছে শ্রমিকের চাহিদা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১০০ হেক্টর। কম মেয়াদি আউশ ধান কাটার পর কৃষকরা বিনা-৭, গ্রানুলা, সানশাইন, কারেজসহ বিভিন্ন জাতের আলু রোপণ করছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগাম আলু চাষে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। জমি ইজারা, বীজ, সার, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তবে মৌসুমের শুরুতে বাজারে আলুর দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় লাভের আশায় এই ঝুঁকি নিচ্ছেন তারা।
বাহাগিলি ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম দুই বিঘা জমি ৪০ হাজার টাকায় চুক্তিতে নিয়েছেন। নিজের জমি না থাকায় জমির ভাড়ার পাশাপাশি বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার, জমি প্রস্তুত এবং শ্রমিকের পেছনে তাকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তার আশা, আগাম আলু ভালোভাবে উৎপাদন হলে সেই বিনিয়োগ উঠে আসবে এবং লাভের মুখ দেখবেন।
রণচণ্ডি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, গত মৌসুমে আগাম আলু তুলে মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ৯০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন তিনি। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকে এবার ৪০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন।
তবে সবার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বাবু জানান, গত দুই বছরে আলু চাষ করে তিনি লোকসানের মুখে পড়েছেন। এরপরও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার আবারও আগাম আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছেন তিনি।
কৃষকদের মতে, আগাম আলু চাষে আবহাওয়া ও বাজারদর বড় ধরনের ঝুঁকি। অতিরিক্ত বৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা বাজারে দরপতন হলে উৎপাদন খরচও উঠে আসা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে লাভ-লোকসানের হিসাব অনেকটাই নির্ভর করছে ফলন ও মৌসুমের শুরুর বাজারদরের ওপর।
এদিকে আলু চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ শ্রমবাজারেও কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। বর্তমানে কিশোরগঞ্জে পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন বলে কৃষক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, সারাদেশের মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় আগাম আলু চাষ ও উত্তোলন শুরু হয়। মৌসুমের শুরুতেই এখানকার আলু দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। এ কারণে কৃষকরা শুরুতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান। কৃষকদের আগাম আলু চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগাম আলু চাষকে ঘিরে ইতোমধ্যে উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠে কৃষকের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। ফলন ভালো এবং বাজারদর অনুকূলে থাকলে আগাম আলু চাষ কৃষকদের গত মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোরের আকাশ/ ইউএম