নারীদের মাথায় আঘাত করাই ছিল বিকৃত আনন্দ: 'সাইকো কিলার' মোরশেদ গ্রেফতার

নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় গভীর রাতে দেয়াল টপকে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত নারীদের মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া এক ভয়ঙ্কর ‘সাইকো’ আন্তঃজেলা সিরিয়াল কিলারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গোলাম মোরশেদ ওরফে মোরশেদ আলম (২৭) নামের এই যুবকের হামলায় ১ জন নিহত ও অন্তত ১৭-১৮ জন গুরুতর জখম হয়েছেন।
গত ১০ জুন (বুধবার) ভোরে গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার শরীফপুর কোনাবাড়ী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে নওগাঁ জেলা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত মোরশেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের হইবর রহমান ওরফে হবিবরের ছেলে।
আজ ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় নওগাঁ জেলা পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর মোরশেদ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এক কলেজছাত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ ও জাহানপুর গ্রামে প্রথম হানা দেয় এই সিরিয়াল কিলার। সে স্থানীয় হাসান আলীর বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে তার কলেজপড়ুয়া মেয়ে উম্মে হাবিবার ঘরে প্রবেশ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই টিউবওয়েলের হাতল (হ্যান্ডেল) দিয়ে হাবিবার মাথায় মারাত্মক আঘাত করে পালিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে হাবিবা মারা যান। একই রাতে সে আরও দুটি বাড়িতে ঢুকে একইভাবে ভিকটিমদের মাথায় আঘাত করে। এ ঘটনায় ধামইরহাট থানায় মামলা হলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এরপর গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ধামইরহাটের জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের ঘরে ঢুকে তার স্ত্রী সুলতানা বেগমকে বাঁশ দিয়ে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে মোরশেদ। একই রাতে সে ওই এলাকার আরও তিনটি বাড়িতে ঢুকে ‘ভোদো’ নামের এক ব্যক্তির মাথায় টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল দিয়ে আঘাত করে পালায়। একের পর এক এমন রহস্যময় ও পৈশাচিক হামলায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও জনমনে গভীর ভীতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সুপার নিজে ওই এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং আশ্বস্ত করেন।
ধামইরহাটের পর এই সিরিয়াল কিলার তার লক্ষ্যবস্তু বানায় বদলগাছী ও পত্নীতলা উপজেলাকে। গত ৭ মে বদলগাছীর দুর্গাপুর, গোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে তিনটি বাড়ির দেয়াল টপকে ঘরে ঢোকে সে। সেখানে শাহনাজ (২২), নাসরিন (১৩) এবং বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০)-কে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়।
সর্বশেষ গত ৪ জুন পত্নীতলা উপজেলার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে গভীর রাতে হানা দেয় মোরশেদ। একটি বাড়িতে দেয়াল টপকে ঢুকে রোজি আক্তার (৩৭) এবং অপর একটি বাড়ির জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আলতা বানু (৪৫) ও তার মেয়ে আসমা খাতুন (২২)-কে লোহার শাবল দিয়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত করে জখম করে।
একের পর এক ক্লু-লেস হামলার রহস্য উদঘাটনে নওগাঁর পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে এবং অ্যাডিশনাল এসপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে ডিবি ও সাইবার ইউনিটের সমন্বয়ে একটি চৌকস টিম গঠন করা হয়।
তদন্তকারী দল তথ্য-প্রযুক্তি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে ধামইরহাট, বদলগাছী ও পত্নীতলা থানার ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে। একপর্যায়ে জানা যায়, শুধু নওগাঁ নয়, পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলাতেও একই কায়দায় বেশ কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সব জেলার তথ্য সংগ্রহ ও ক্রাইম প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই সব অপরাধের পেছনে মূল হোতা একজনই।
এরপর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় গাজীপুরে বিশেষ অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। ১০ জুন ভোর সাড়ে ৬টার দিকে গাজীপুরের বাসন থানার শরীফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে কুখ্যাত এই সিরিয়াল কিলারকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে মোরশেদ স্বীকার করেছে, সে চুরি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়, বরং নারীদের মাথায় আঘাত করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেত। নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলা মিলিয়ে সে অন্তত ১৭-১৮ জন নারীর ওপর এমন বর্বর হামলা চালিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, "নওগাঁ জেলা পুলিশ অত্যন্ত নিবিড় ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে এই ক্লু-লেস মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই সিরিয়াল কিলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ জন ভিকটিমকে মাথায় আঘাত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, জয়পুরহাট এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে সংঘটিত আরও দুই নারীর আঘাতজনিত মৃত্যুর পেছনেও এই মোরশেদ জড়িত। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে।"
পুলিশ সুপার আরও জানান, এই ঘটনায় নওগাঁর বিভিন্ন থানায় হত্যা মামলাসহ মোট ৪টি মামলা রুজু করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর আইন প্রয়োগে বদ্ধপরিকর। আসামিকে ইতিমধ্যেই বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এনএস