বিল-জলাশয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী মাছ শিকার 'বৈত'

হাতে হাতে পলো (বাঁশের তৈরি মাছ ধরার খাঁচা) নিয়ে মানুষের যেন স্রোত নেমেছে। পায়ে হেঁটে, বাই-সাইকেলে অটোরিকশায় যে যেভাবে পারছে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুঁটছে। মাঝে মধ্যে বাতাসে ভেসে আসছে শিঙ্গার শব্দ। আর সেই শব্দ অনুসরণ করে ছুটে চলছে মানুষ।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুরে তাদের যাত্রায় অংশ নিয়ে জানা যায়, সবার গন্তব্য গাইবান্ধার সাঘাটার চিতলীর বিলে। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি বৈত উৎসব হিসেবে বেশ পরিচিত। তাদের হাতে ও কাঁধে নানা ধরনের মাছ ধরার উপকরণ। যেমন- পলো, হ্যাংগা জালি, হ্যাগা, মুঠ জাল, কোঁচ, ক্যাটা ও ঝাঁকি জাল।

এই উৎসবে অংশ গ্রহণকারীদের চোখে মুখে ছিল অন্য রকম আনন্দ উচ্ছ্বাস। বিলের জলে পলো ফেলে বড় মাছটাই ধরতে হবে-এমন আশা সবারই। এতে দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকার করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
কথা হয় 'বৈত' এ অংশ নেওয়া সদর উপজেলার তুলসিঘাট থেকে আসা শাহিন মিয়ার সঙ্গে (৪০)। তিনি জানান, মাছ ধরতে তার খুব ভালো লাগে। আর যদি হয় 'বৈত' তাহলে তো কথাই নাই। তিনি বলেন, খবর পেয়ে সকালেই এখানে এসেছি। এসে 'বৈত' এ অংশগ্রহণ করেছি। একটা মাছও পাইনি। তাতে সমস্যা নাই অংশগ্রহণ করতে পেরেছি এটাই বেশি আনন্দের।

বিলে পলো নিয়ে নেমে পড়েছেন রমজান আলী। তিনি এসেছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা থেকে, ভাগ্যক্রমে তিনি পেয়েছেন মাঝারি সাইজের একটি রুই মাছ। তিনি বলেন, এই দলে কম করেও তিন-চারশ মানুষ আছেন। শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছাত্র, কৃষক সবাই মিলেমিশে একাকার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার ৭টি উপজেলাতেই শৌখিন মাছশিকারির পৃথক পৃথক দল রয়েছে। বৈত দলের আলোচনার ভিত্তিতে মাছ শিকারের নির্দিষ্ট জলাশয়, তারিখ, সময়, যাত্রার স্থান নির্ধারণ করে জানিয়ে দেয়া হয়। এই বৈতের দলের একজন দলনেতা থাকে। যার কাছে থাকে মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বড় একটি বাঁশি। যাকে বলা হয় বৈদের শিঙা। যা দিয়ে উচ্চৈঃস্বরে শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। পূর্বনির্ধারিত এলাকায় এসে শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হয়।
আর শিঙ্গায় আহ্বানে নিজ পছন্দমতো মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম নিয়ে সমবেত হতে থাকে মৎস্য শিকারিরা। পরে বিল বা জলাশয়ে দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকার চলে। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যে কেউ এতে অংশগ্রহণ করতে পারে। বৈদে মাছ মারা চলে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত। চলে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে। এতে অনেকে মাছ পায় আবার অনেকে একটি মাছও পায় না।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বৈত এর দলনেতা আব্দুল হালিম মিয়া (৬০) বলেন, মাছ না পেলেও বৈদ শিকারিদের কোনো দুঃখ নেই। কেননা এখানে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দটাই মুখ্যবিষয়। আমরা ছোট মাছ বা ডিম আলা মাছ ধরি না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আগে বৈদ দল জলাশয়ে নামলে সবাই খুশি হতো। ভিড় করে দেখতে আসত। কিন্তু আজকাল কোথাও কোথাও মালিকানা দাবি করে বাধা দেয়া হয়। অনেক সময় ফিরে যেতে হয় মাছ শিকার না করেই।
ভোরের আকাশ/মো.আ.