২০ বছরের উন্নয়ন ঘাটতি পূরণে বগুড়ার জন্য বড় পরিকল্পনা

বগুড়ার গত ২০ বছরের উন্নয়ন ঘাটতি পূরণে রেলপথ, বিমানবন্দর, সিটি করপোরেশন, স্পোর্টস ভিলেজ, শিল্প পার্কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ, প্রায় এক হাজার কোটি টাকার স্পোর্টস ভিলেজ এবং সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে এক হাজার ৯৯৪ কোটি টাকার বরাদ্দ।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে বগুড়ার পাঁচতারকা হোটেল মম-ইনের অডিটোরিয়ামে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত চাই না, শুধু বগুড়ার ২০ বছরের ঘাটতি পূরণ করতে চাই।’
বগুড়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলার সাত সংসদ সদস্যসহ সরকারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উন্নয়নের বিষয়ে কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করেন। গোপালগঞ্জ ও বগুড়াকে তিনি আলাদাভাবে দেখতে চান না। বগুড়ার উন্নয়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এ ছাড়া বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
শহরের যানজট নিরসন ও সৌন্দর্যবর্ধনে করতোয়া নদীর কোল ঘেঁষে চার লেনের সড়ক নির্মাণ এবং প্রধান সড়কগুলো চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নগরায়ণ ও যানজট নিরসনের প্রাথমিক কাজের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বগুড়ায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে এক হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জেলার ১৩টি উপজেলার টেকসই উন্নয়নে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে আরও দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডিএ) গঠনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়ায় দ্রুত বিসিক শিল্প পার্কের কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া নতুন শিল্পনগরী গড়ে তোলা এবং আলু থেকে স্টার্চ উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকের উৎপাদিত আলুর নতুন বাজার তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, উপজেলা ডাকবাংলো ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বহুমুখী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বগুড়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, জেলাটি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। এখানে বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ গত ২০ বছর ধরে বগুড়া কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়াকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করতে সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়ন বরাদ্দের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জের জন্য এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট জেলার জন্য নয়, দেশের সব মানুষের জীবনমান উন্নত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। বগুড়ার সার্বিক উন্নয়নে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ায় দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবারের দুর্গোৎসবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে তিনটি অঞ্চলে দুর্গাপূজা পরিদর্শনে গেছেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিগত নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপির প্রতি আস্থা রেখে ভোট দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেই আস্থার প্রতিফলন হিসেবে সারা দেশে এক হাজার ২০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে বলেও জানান তিনি। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেছে।
এ ছাড়া বাসাবাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সরকার কিনবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সম্পাদক লোটন একরাম।
সভায় বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন,বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান,পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান,পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ,বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যান ট্রাস্টের সদস্য ও বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ।
এ ছাড়া সভায় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ভোরের আকাশ/আ.র