খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভূমিকা রাখবে গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার: কৃষিমন্ত্রী

দেশীয় কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেন, পচনশীল খাদ্যদ্রব্য এবং আম, কাঁঠাল ও আনারসের মতো দেশীয় ফলের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে না পারায় সেই বাজারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) গাজীপুরের ভবানীপুরে দেশের প্রথম বৃহৎ পরিসরের ‘গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, চলতি বছর দেশে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি। দেশে প্রথমবারের মতো পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীতে এক কেজি পেঁয়াজও আমদানি করার প্রয়োজন হবে না।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিপণ্য এখনো প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারা হতাশাজনক উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর অন্যতম কারণ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কৃষিপণ্যকে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানির উপযোগী ও নিরাপদ করতে গাজীপুরে গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিপণ্যের পচন রোধ, ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস এবং সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের চাহিদা ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। মন্ত্রী আরও বলেন, কৃষিপণ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার কাজ করছে। গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে মৌসুমি ফলসহ গাজর ও ক্যাপসিকামের মতো সবজি প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। এতে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে।
নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন খাদ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেসব খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলোর আমদানি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) অধীনে নির্মিত ৫ লাখ কিউরি ক্ষমতাসম্পন্ন এ কেন্দ্রটি দেশের কৃষি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিনিধি ড. জিয়াকুন শি, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা।
বিনা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চায়না আইসোটোপ অ্যান্ড রেডিয়েশন করপোরেশন’ (সিআইআরসি) আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রটি নির্মাণের কার্যাদেশ পায়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির এটিই প্রথম বড় ধরনের ইপিসি (EPC) প্রকল্প।
কর্তৃপক্ষ জানায়, গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার এমন একটি শিল্প বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে গামা রশ্মি ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য জীবাণুমুক্ত করা হয়। এটি মূলত উন্নত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পণ্য সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা।
এ কেন্দ্রে সাধারণত কোবাল্ট-৬০ নামের তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে গামা রশ্মি নির্গত করা হয়। কোনো পণ্যকে এ রশ্মির মধ্য দিয়ে নেওয়া হলে পণ্যের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গ ধ্বংস হয়। এর মাধ্যমে মসলা, পেঁয়াজ, আলু, শুঁটকি ও ফলমূলের সংরক্ষণকাল বাড়ানো এবং পচন রোধ করা সম্ভব।
এ ছাড়া সিরিঞ্জ, সার্জিক্যাল গ্লাভস, স্যালাইনের সেট ও ব্যান্ডেজের মতো একবার ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর পোকা ও জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর।
গামা রশ্মি প্রয়োগের ফলে পণ্য জীবাণুমুক্ত হলেও পণ্যটি নিজে তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না। তাই নির্ধারিত নিয়ম ও মাত্রা অনুসরণ করে প্রক্রিয়াজাত করা খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহারের জন্য নিরাপদ থাকে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনেও সাভারে একটি গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার রয়েছে, যা বাণিজ্যিক ও গবেষণামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। সংশ্লিষ্টদের আশা, গাজীপুরের নতুন কেন্দ্রটিও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা