সিরাজগঞ্জে যমুনার ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি ও ফসলী জমি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি আজও বেড়েছে। পানি বাড়ার কারনে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে।
নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে পাকা সড়ক, বসতবাড়ি, ফসলী জমি, গাছপালা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সিরাজগঞ্জ জেলা নদী বেষ্টিত। জেলার কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলা যমুনা নদী ঘিরে রেখেছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসলেই দেখা দেয় নদী ভাঙন। তবে এই ভাঙনের জন্য স্থানয়ীরা বালু উত্তোলনকে দায়ি করেছেন। শুস্ক মৌসুম ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর একারনে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। আকস্মিক এই ভাঙনের তীব্রতায় নদী পাড়ের মানুষের মাঝে আতঙ্ক ও শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে।
ভাঙনের মুখে রয়েছে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলী জমি। বিশেষ করে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বড় কয়ড়া, বর্নি, কৈগাড়ি জড়তা ও কাজীপুর উপজেলার চর গিরিশ, নাটুয়াপাড়া ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
নদী ভাঙন থেকে মাত্র ১৫০ মিটার দুরে রয়েছে পশ্চিম চর গিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাট সেন্টার। চর গিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
সদর উপজেলার ভাটপিয়ারি গ্রামের আব্দুস ছালাম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারনে নদী ভাঙছে। বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডেও সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বাঁধের সামনে থেকে এসে বালু তোলে।
একবার ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে লোক এসে দেখে গেছে। কিন্তু বালু তোলা বন্ধ হয়নি। বালু তোলা বন্ধ হলে ভাঙনও বন্ধ হবে। নদীর মাঝখানে বিশাল চর পড়েছিল। কিন্তু বালু উঠানোর কারনে ধীরে ধীরে পুরা চর নদীর মধ্যে ভেঙে গেছে। এই চরে আমি কুশাল, গম, কালাই সহ বিভিন্ন ধরনের আবাদ করতাম। এখন আমার কিছুই নাই। পথের ফকির বলা চলে।
সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ড মেম্বর আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া বলেন, কাওয়াকোলা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বড় কয়ড়া, বর্নি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রামে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে। বসতবাড়ি, ফসলী জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব নদীতে চলে যাচ্ছে।
চরের ছেলে মেয়েদের জন্য পড়ালেখার একমাত্র মাধ্যম বর্নি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যে কোন সময় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। দুর্যোগ আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘরে (মুজিব কিল্লা) অস্থায়ী ভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষা অফিস ও ইউএনও মহোদয়কে অবগত করা হয়েছে। ভাঙনের কারনে এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবী গত কয়েক দিনে কাজীপুর উপজেলার চর গিরিশ, নাটুয়াপাড়া ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি-ঘর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কারনে এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। অনেকে ঘর-বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। বাড়ি-ঘর হারানো এসব পরিবারের তালিকা করে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন কাজীপুর উপজেলার নির্বাহী অফিসার।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্টে এলাকায় ৯সেন্টিমিটার ও কাজীপুর মেঘাইঘাট পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
তবে পানি বাড়লেও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৯ সেন্টিমিটার ও কাজীপুর পয়েন্টে বিপদ সীমার ১৮৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ভর্তি বালুর বস্তা ফেলা ভাঙন রোধে কাজ করছে।
কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাজীপুরে বিভিন্ন পয়েন্টে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। বসতবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙনের মুখে থাকা পশ্চিম চর গিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এপর্যন্ত ৩০-৩৫ জনের নাম আমরা পেয়েছি যাদের বাড়ি ঘর যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। আমরা তালিকা করছি। ইতিমধ্যে আমরা বরাদ্দ পেয়েছি। আপাতত প্রত্যেককে ৩০ কেজি করে চালা দেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, পানি বাড়ার কারনে কিছু কিছু জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা জিও ব্যাগ ভর্তি বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছি।
ভোরের আকাশ/ র.ই