কুড়িগ্রামে একসঙ্গে তিন পুত্রসন্তানের জন্ম, লালন-পালনের খরচ জোগাতে দিশেহারা কল্পনা

একসঙ্গে তিন পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে মা হওয়ার আনন্দে ভরে উঠেছিল কল্পনা বেগমের (২৫) জীবন। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে চরম দুশ্চিন্তা। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। অন্যদিকে, তিন নবজাতকের দুধ ও নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে তার অসচ্ছল পরিবার। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এই মায়ের।
কল্পনা বেগম কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ এলাকার জায়দুল হকের স্ত্রী। তার স্বামী বাক্প্রতিবন্ধী। আন্ধারীঝাড় বাজারের একটি হোটেলে শ্রমিকের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। বর্তমানে তিন সন্তানকে নিয়ে ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়নের দেওয়ানের খামার গ্রামে দিনমজুর বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন কল্পনা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২৩ আগস্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিন পুত্রসন্তানের জন্ম দেন কল্পনা। সন্তানদের নাম রাখা হয়েছে হাসান, হোসাইন ও বেল্লাল। জন্মের সময় হাসানের ওজন ছিল ২ কেজি এবং হোসাইন ও বেল্লালের ওজন ছিল ১ কেজি ৯০০ গ্রাম করে। ইতিমধ্যে সন্তানদের বয়স এক মাস পেরিয়েছে। তিন নবজাতক সুস্থ থাকলেও অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হওয়ায় এক মাস ধরে অসুস্থ রয়েছেন কল্পনা।
তিন সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেন এই মা। কিন্তু প্রতিদিনের চিকিৎসা ও খাবারের খরচের হিসাব তাকে বারবার অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করাচ্ছে। নিজের ওষুধ কিনতে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার টাকা এবং তিন সন্তানের জন্য দুধ কিনতে প্রায় ৬০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন দুই হাজার টাকার বেশি খরচ জোগানো তাঁর পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কল্পনা বেগম বলেন, একসঙ্গে তিন সন্তানের মা হতে পেরে আমি খুব খুশি। কিন্তু নিজের অসুস্থতা আর সন্তানদের খরচ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। প্রতিদিন আমার ওষুধের জন্য প্রায় দেড় হাজার টাকা লাগে। তিন সন্তানের জন্য দুই প্যাকেট দুধ কিনতে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়। আমার স্বামী বাক্প্রতিবন্ধী। তিনি আন্ধারীঝাড় বাজারের একটি হোটেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তাঁর সামান্য আয়ে সংসার চালানোই কঠিন। সন্তানদের খাবার ও আমার চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সন্তানদের জন্য সরকারি বা অন্য কোনো সহযোগিতা পেলে খুব উপকার হতো।
কল্পনার বাবা আবুল কালাম বলেন, আমরা গরিব ও অসহায় মানুষ। তিনটি শিশুর জীবন রক্ষা ও তাদের সুস্থভাবে বড় করে তোলার সামর্থ্য আমাদের নেই। মেয়ের চিকিৎসা ও নাতিদের খাবারের খরচ জোগাতে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সমাজের বিত্তবান ও দানশীল মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাচ্ছি।
ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে থাকা আব্দুল লতিফ বলেন, কল্পনা বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তাকে পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে। পরিচয়পত্র হলে তার জন্য একটি ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া তার স্বামী নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা হওয়ায় তাঁর প্রতিবন্ধী ভাতা বা পরিচয়পত্রের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলা হবে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ বলেন, পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু নগদ অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামী সোমবার তাদের আবার ডাকা হয়েছে। সেদিন আরও কিছু সহায়তা দেওয়া হবে।
তিন নবজাতককে ঘিরে কল্পনার স্বপ্ন অনেক। কিন্তু নিজের চিকিৎসা ও সন্তানদের খাবারের নিশ্চয়তা না থাকায় সেই স্বপ্নের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। অসুস্থ শরীর নিয়ে সন্তানদের আগলে রাখা এই মায়ের এখন একটাই চাওয়া—সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং নিজের চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা।
ভোরের আকাশ/আ.র