২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কোটালীপাড়ার বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ

কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজক কমিটি নেই, নেই সরকারি-বেসরকারি পুরস্কারের ব্যবস্থাও। তবু পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য আর মানুষের ভালোবাসায় প্রায় ২০০ বছর ধরে টিকে আছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ।
দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী ও লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী এ লোকজ উৎসবে অংশ নেন বিভিন্ন জেলার মাঝি-মাল্লারা। আর তাঁদের ছন্দময় বৈঠার টানে খালের দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো দর্শনার্থী।
কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের কালীগঞ্জে বাঘিয়ার বিলসংলগ্ন বাবুর খালে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এ নৌকা বাইচ। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ লোকজ আয়োজন হিসেবে পরিচিত এ উৎসবকে ঘিরে প্রতিবছরই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছর আগে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে এলাকার মানুষ নৌকা নিয়ে জমিদার শিবরাম চৌধুরীর বাড়িতে যেতেন। পূজা শেষে বাড়ি ফেরার পথে নৌকায় নৌকায় প্রতিযোগিতা শুরু হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রতিযোগিতাই রূপ নেয় ঐতিহ্যবাহী বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচে।
এ আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এর পেছনে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি কিংবা পুরস্কারের আকর্ষণ। মাঝি-মাল্লারা নিজেদের উদ্যোগেই নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদই তাঁদের এ আয়োজনে টেনে আনে।
প্রতিবছর কোটালীপাড়াসহ মাদারীপুর, পিরোজপুর, নড়াইল ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অর্ধশতাধিক নৌকা এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলকাটা, জয়নগর ও বাছারীসহ বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন মাঝি-মাল্লারা। নৌকার গঠন, বৈঠার ছন্দ ও মাঝিদের সম্মিলিত শক্তি মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
নৌকা বাইচ চলাকালে ঠিকারী ও কাঁশির বাদ্যের তালে তালে সারি ও জারি গান গেয়ে বৈঠা চালান মাঝি-মাল্লারা। তাঁদের ছন্দময় বৈঠার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শনার্থীদের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে খালের দুই পাড়। নৌকাগুলোর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন মানুষ।
এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বাঘিয়ার বিলের পাড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। পানিতে ভাসমান নৌকাতেও বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে নৌকা বাইচ পরিণত হয় সর্বজনীন মিলনমেলায়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
একসময় উন্মুক্ত বিলে অনুষ্ঠিত হতো এ নৌকা বাইচ। তবে বর্তমানে বিলে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কালীগঞ্জ বাজারসংলগ্ন বাবুর খালে আয়োজন করা হচ্ছে প্রতিযোগিতাটি। এ কারণে ঐতিহ্য ধরে রাখতে খালটি সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের অংশ। কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি কিংবা পুরস্কার ছাড়াই শত শত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে টিকে থাকা এ আয়োজন প্রমাণ করে, লোকজ ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের ভালোবাসা ও শেকড়ের প্রতি টান।
তাই এ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাবুর খাল সংরক্ষণ, নৌযান চলাচলের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং লোকজ সংস্কৃতির এ নিদর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
ভোরের আকাশ/সু.পা