রূপগঞ্জের ভুলতায় সিন্ডিকেটের দখলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, দুর্ভোগে যাত্রী ও পথচারী

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা-গাউছিয়া এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কের দুই পাশ ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ভাসমান দোকানপাট। এসব দোকান বসানো ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কে যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দূরপাল্লার যাত্রী, পথচারী ও পরিবহন চালকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভুলতা হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের পাশেই মহাসড়কের দুই পাশে বসেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান। কোথাও কাঁচাবাজার, মাছ ও সবজির পসরা, আবার কোথাও কাপড়, জুতা ও ফলমূলের দোকান। ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ফ্লাইওভারের নিচে কলা, ডাব ও আখ বিক্রির শতাধিক ভাসমান দোকান রয়েছে। গোলাকান্দাইল মফিজ প্লাজা থেকে গাউছিয়া মার্কেট ও রেদোয়ান টাওয়ার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ বেচাকেনা।
এ ছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পিকআপ ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। ভুলতা-গোলাকান্দাইল এলাকায় উল্টো পথে যানবাহন চলাচলের কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সড়কের একটি বড় অংশ দখলে থাকায় স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল করে নতুন দোকান বসাতে অগ্রিম ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতার খরচের কথা বলে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৩০০ টাকা করে আদায় করা হয়। এসব অর্থ আদায়ের পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাদের প্রশ্ন, বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও কীভাবে আবার মহাসড়ক দখল হয়ে যায়? কারা এসব অবৈধ দোকান বসানোর সুযোগ করে দিচ্ছে এবং কারা অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয়দের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না; দখল ও চাঁদাবাজির পেছনে থাকা কথিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন গত বছর দুই থেকে তিন দফা এবং চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসেও কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় মহাসড়ক। বছরের অধিকাংশ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা থেকে বরপা ও রূপসী পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। মহাসড়কের সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজও যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অনেকে।
সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার পর আবারও সড়ক দখল বাড়তে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গত মাসে নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুল্লাহ-বিন-শফিক যোগদানের পরও মহাসড়কের দুই পাশে দোকানপাটের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম ফারুক খোকন বলেন, “ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সড়ক বেদখল হওয়া কারও কাম্য নয়। যেকোনো মূল্যে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সড়ক চলাচলের উপযোগী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে পথচারী ও যাত্রীদের চলাচল সহজ হবে।”
ভুলতা হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, “মহাসড়কের নিরাপত্তার স্বার্থে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মহাসড়কের প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হলে যানজট কমবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মহাসড়ক থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে যানজট নিরসন আরও সহজ হবে।”
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, “এই বিষয় আমার জানা নাই। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুল্লাহ-বিন-শফিক বলেন, “গত মাসে আমি এখানে যোগদান করেছি। জনদুর্ভোগ নিরসনে মহাসড়কের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে ইতিমধ্যে চার দিন সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপু বলেন, “বিএনপি সব সময় জনকল্যাণে নিয়োজিত। জনদুর্ভোগ কমাতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অবৈধ দখলদারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে স্থায়ীভাবে যানজট নিরসন করতে হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়ক দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান, অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে সড়ক দখলের এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
ভোরের আকাশ/ এনউব