ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডে এমপিপুত্র মিন্টু ডিবি হেফাজতে

নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজারসংলগ্ন একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পরে গভীর রাতে তাঁকে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টুকে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে। সোমবার রাতে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ তাঁকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত শাকিল ইসলাম রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাত ৮টার দিকে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তাঁরা মিন্টুকে গ্রেপ্তার ও শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রাত ১০টার দিকে মিন্টুকে আটক করা হয় বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। তাঁকে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানার ওসির কক্ষে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক সূত্রে পাওয়া এসব তথ্যের সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে নিহত শাকিলের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সন্তান জড়িত থাকলেও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
এ সময় সংসদ সদস্য ও পুলিশের উপস্থিতিতে শাকিলের বাবা রবিউল করিম আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অবহেলার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি। মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও সেটি অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যেভাবে হামলার শিকার হন শাকিল
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন শাকিল। হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলি এড়াতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তাঁর পিছু নেন। পরে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়।
হামলার পর স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই রাতেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিল জানিয়েছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলি না লাগায় তিনি দৌড় দেন। পরে হামলাকারীরা তাঁকে ধাওয়া করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পরপর দুটি গুলির শব্দ শুনতে পান তাঁরা। এগিয়ে গিয়ে শাকিলকে দৌড়াতে দেখেন। এ সময় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তাঁকে ধাওয়া করছিলেন। কিছুক্ষণ পর হামলাকারীদের রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে ফিরে যেতে দেখেন তিনি। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে শাকিলকে চিৎকার করতে শুনে তাঁরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
গত ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ জানান, হামলার রাতেই শাকিলকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিলের কিডনি কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরে আইসিইউতে নেওয়ার পর লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, মামলার আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে বলেও জানান তিনি।
ভোরের আকাশ/সু.পা