বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার: সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় খুবি

বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সেরা পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি উদ্ভাবনী দল অংশ নেয়, যার মধ্যে ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী আজমাইন ইনকিয়াদ হকের 'স্মার্ট হুইলচেয়ার' প্রকল্পটি সারা দেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।
১৪ সেপ্টেম্বর (সোমবার) রাজধানীর নভোথিয়েটারে তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা।
রাজধানীর নভোথিয়েটারে গত শনিবার তিন দিনব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন হয়। 'Innovation Ecosystem Toward Trillion Dollar Economy' প্রতিপাদ্যে আয়োজিত মেলায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকেরা অংশ নেন।
মেলায় জমা পড়া ৯৬৩টি উদ্ভাবনী প্রকল্পের মধ্যে প্রথমে সেরা ৫০-এ, এরপর সেরা ১০-এ এবং সবশেষে ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে জাতীয়ভাবে দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নেয় ‘স্মার্ট হুইলচেয়ার’ প্রকল্পটি। দলনেতা আজমাইন ইনকিয়াদ হক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাদের উদ্ভাবন উপস্থাপনের সুযোগ পান। প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ প্রকল্পের ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে এটুআই-এর সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তুলনামূলক কম খরচে বিকল্প নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাসম্পন্ন হুইলচেয়ার তৈরিই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। প্রচলিত জয়স্টিকের পরিবর্তে শরীরের সচল বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে হুইলচেয়ার পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে এতে।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইরুজ জাহিন খান জানান, প্রযুক্তিটির প্রাথমিক সংস্করণ প্রায় ৩০ হাজার টাকায় তৈরি করা সম্ভব। 'Innovate to Market' উদ্যোগের আওতায় প্রকল্পটি এক লাখ টাকা পুরস্কার পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ফান্ড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মেলায় উপস্থাপনের পর বিভিন্ন পক্ষ থেকে অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রস্তাব আসছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি দলের মধ্যে ছিল- স্মার্ট হুইলচেয়ার, নিও সেভার, এআই-বেজড ক্যাম্পাস সিকিউরিটি, ব্লিস সিহাত, হাই ভোল্টেজ এনার্জি-এফিশিয়েন্ট থ্রিডি প্রিন্টার, ইকোলিংক, এআই-পাওয়ার্ড ইসিজি স্ক্রিনিং ডিভাইস, ট্রু-সাইট ও আরবান আর্থ। এর মধ্যে 'নিও সেভার' দল এর আগে সেরা উদ্ভাবনী প্রকল্প ক্যাটাগরিতে সিড ফান্ডিং অর্জন করেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ 'Ecogen Sundarban', একটি কমিউনিটি-বেইজড ইকোট্যুরিজম মডেল, যার লক্ষ্য পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। মডেলে রয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবেশ সচেতনতার জন্য Community Learning Hub, পর্যটন অভিজ্ঞতার জন্য Smart Eco-Experience System, তথ্য ও বুকিংয়ের জন্য Digital Ecotourism Gateway, স্থানীয় পণ্য ও সেবার বাজারজাতকরণের জন্য Digital Local Enterprise Marketplace এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য Environmental Monitoring and Data Dashboard। প্রাথমিকভাবে খুলনার দাকোপ ও বাগেরহাটের মোংলা এলাকায় এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে ইউএনডিপি-সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর চেয়ার হোল্ডার ড. মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদারও উদ্যোগটির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও সহযোগিতার আগ্রহ পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক সিএসই ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. জি. এম. আতিউর রহমান, ইসিই ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. মাহবুব হোসেন, এফডব্লিউটি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম এবং ইসিই ডিসিপ্লিনের প্রফেসর এস. এম. শামসুল আলম এর তত্ত্বাবধানে নয়টি দল এ মেলায় অংশ নেয়।
মেলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টল পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম, নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. নাজমুস সাদাত, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. মো. নূরুন্নবী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. আশিক উর রহমান এবং ইনোভেশন হাবের পরিচালক ড. জি. এম. আতিকুর রহমান। তারা উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ইনোভেশন হাবের পরিচালক ড. জি. এম. আতিকুর রহমান বলেন, ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রামের মাধ্যমে উদ্ভাবনী দলগুলোকে নির্বাচন, মেন্টরিং, অর্থায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রোগ্রামের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দল আজ জাতীয় পর্যায়ের এই মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ সফলতা পেয়েছে।
ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ সেরা পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পাওয়া এবং ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে ‘স্মার্ট হুইলচেয়ার’ প্রকল্প দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম।
এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি বলেন, সেরা পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পাওয়া এবং প্রায় আট শতাধিক প্রকল্পের মধ্যে ‘স্মার্ট হুইলচেয়ার’-এর দ্বিতীয় স্থান অর্জন অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। এটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার জাতীয় পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।
তিনি আরও বলেন, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও গবেষণাকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও মানুষের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার যে দৃষ্টিভঙ্গি সরকার সামনে এনেছে, এ ধরনের আয়োজন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন যেন বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে আসে এবং শিল্প ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়, সে লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।