কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রে ভাঙনের তাণ্ডব, জমির কাঁচা-পাকা ধান কাটতে মরিয়া কৃষক

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নদীতীরের মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে প্রায় ২০০ পরিবার।
একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি নদে বিলীন হচ্ছে। বসতভিটা হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের জমিতে, কেউবা নদীর কিনারে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করছেন। অন্যদিকে, ভাঙনের মুখে থাকা জমির কাঁচা-পাকা আমন ধান কাটতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। তাদের চোখের সামনেই তীব্র স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত এক সপ্তাহে এ দুই এলাকায় ১৭টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে নদে তলিয়ে গেছে আমন ধান, ভুট্টা ও শাকসবজির ক্ষেত। ভাঙনের মুখে থাকা জমি থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকেরা ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটছেন। তাদের ফসল কাটার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের স্রোত বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। চর শৌলমারী ইউনিয়নের সোনাপুর, চর সোনাপুর, গুচ্ছগ্রাম, চর গেন্দার আলগা, ঘুঘুমারী, সুখেরবাতি, দক্ষিণ নামজের চর, হবিগঞ্জ ও খেদাইমারী এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। দিনরাত নদীর তীব্র স্রোতে বসতভিটা ও কৃষিজমি বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুখেরবাতি এলাকায় সাতটি এবং পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। সুখেরবাতি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন দেলোয়ার, নজরুল ইসলাম, রুপচান, আয়শা খাতুন, ছোবহান ও লালু শেখ। খেদাইমারী এলাকায় কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, হাতেম, কদম আলী, আব্দুল খালেক, মহর উদ্দিন, সিরাজুল, জমসের আলী ও আক্কাস আলীর বাড়ি ভাঙনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া চরে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করা আরও দুই ব্যক্তির বসতভিটাও নদে বিলীন হয়েছে।
বসতভিটার পাশাপাশি কৃষিজমি হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। সুখেরবাতি এলাকার ইউনুছ মোল্লার দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদে বিলীন হয়েছে। একই এলাকার ছবুর প্রামাণিকের চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা নদীতে চলে গেছে। খেদাইমারী এলাকার জমসের আলীর বসতভিটার সঙ্গে বিলীন হয়েছে তার তিন বিঘা ধানি জমি।
ক্ষতিগ্রস্ত জমসের আলী বলেন, ‘আমাগো বাড়িভিটাসহ তিন বিঘা জমি নদীতে গেছে। অহন আমি কী করুম! ধারদেনা করি মানুষের জমিতে ঘর উঠাইছি।’ বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্দশা দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত এক বছরেই এ এলাকায় প্রায় সাড়ে ৫০০ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে। বসতভিটা হারানো অনেক পরিবার অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার জায়গার অভাবে কেউ কেউ নদীর কিনারে পাটের শোলা ও টিন দিয়ে অস্থায়ী ছাপড়া ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনছার আলী তুহিন বলেন, ভাঙনে অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছয় থেকে সাত মাস আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলেছিল। কিন্তু সেগুলোও নদীগর্ভে চলে গেছে। কার্যকর তদারকি ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় ভাঙন থামছে না। এতে প্রতিবছর নতুন নতুন পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান বলেন, সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর এলাকায় ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্লক স্থাপন না করায় শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। আগে ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলেও এখন তা বন্ধ রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে নতুন করে ঘর তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, ভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বহু পরিবার বসতভিটা হারাবে। পাশাপাশি চলতি মৌসুমের আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসল নদীগর্ভে বিলীন হলে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জরুরি কাজের জন্য বর্তমানে কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ভোরের আকাশ/আ.র