বরই চাষে বাজিমাত করলেন কৃষক জাফর হোসেন

মেঘনা উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর ঐতিহ্যগতভাবে সবজি উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু এবার সেই জনপদে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার নাম, বাণিজ্যিক বরই চাষ। ইউটিউবে কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ-এর অনুপ্রেরণামূলক প্রতিবেদন দেখে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সদর উপজেলার কৃষক জাফর হোসেন।
মাত্র ১১ মাসেই তার বরই বাগানে এসেছে বাম্পার ফলন, আর ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন প্রায় ৬০ হাজার টাকার বরই। সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের সূতার গোপটার ইজতেমা মাঠ এলাকায় ৭২ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন তার স্বপ্নের বাগান। গাজীপুর থেকে কুরিয়ারযোগে সংগ্রহ করা উন্নত জাতের চারা রোপণ করে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতা ও এক কৃষি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পরামর্শ তার এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হীরামন পোস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা জাফর হোসেন প্রায় ১৭ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। মৌসুমি সবজি চাষ ছিল তার প্রধান আয়ের উৎস। তবে বিভিন্ন সময়ে লোকসানের মুখে পড়ে বিকল্প খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এক আত্মীয়ের পরামর্শে এবং ইউটিউবে নিয়মিত কৃষিবিষয়ক প্রতিবেদন দেখে বরই চাষে মনোনিবেশ করেন তিনি।
জাফর হোসেন জানান, “প্রথমে জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করি। এক ফুট গভীর করে গর্ত তৈরি করে চারা রোপণ করি। নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে ১৮ মাসের মাথায় গাছে আশানুরূপ ফলন এসেছে। গাছ থেকেই পাকা বরই সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছি। এতে স্বাদও ভালো থাকছে, দামও পাচ্ছি।”
তার বাগানে বর্তমানে কাশ্মেরী ও বল সুন্দরী জাতের বরই উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিটি গাছ এখন ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা। প্রতিদিন চারজন শ্রমিক ৬০০ টাকা হারে কাজ করেন, প্রয়োজন হলে দুইজন নারী শ্রমিকও নিয়োগ দেওয়া হয়। বার্ষিক চুক্তিতে নেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা এই বাগান এখন স্থানীয়দের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল খালেক বলেন, “ভবানীগঞ্জ সবজি চাষে সুনাম কুড়ালেও বরই চাষ হবে,এটা কেউ ভাবেনি। জাফরের বাগানে যেভাবে ফলন হয়েছে, তাতে তিনি এ বছরই খরচ উঠিয়ে লাভে যেতে পারবেন বলে আশা করছি।”
বরই কিনতে আসা ব্যবসায়ী মো. জসিম মাহমুদ বলেন, “বরইগুলো অত্যন্ত মিষ্টি ও মানসম্মত। লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া বরই চাষের জন্য উপযোগী বলেই মনে হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ফসল বৈচিত্র্য আনতে ফলচাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাফর হোসেনের সফলতা প্রমাণ করেছে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে কৃষকরা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারেন।
বরই চাষে জাফরের এই সাফল্য ইতোমধ্যেই আশপাশের কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছে। অনেকেই তার বাগান পরিদর্শন করছেন এবং বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের বরই চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ বিস্তৃত হলে মেঘনা তীরবর্তী লক্ষ্মীপুর কৃষিক্ষেত্রে নতুন পরিচয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
জাফর হোসেনের কথায়, “পরিশ্রম আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে কৃষিতেই সফল হওয়া সম্ভব। আমি চাই, আমাদের এলাকার আরও কৃষক ফলচাষে আগ্রহী হোন।” লক্ষ্মীপুরে বরই চাষের এই সাফল্য কেবল একজন কৃষকের গল্প নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষির সম্ভাবনাময় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ভোরের আকাশ/ র.ই