বগুড়ার আরিফ-দম্পতির
২৫ বছরের সংগ্রামের গল্প ‘নিহা খামার বাড়ি’

বিকেলের নরম আলোয় চারপাশটা যখন কিছুটা শান্ত হয়ে আসে, বগুড়ার কাহালুর ৫ নম্বর মুরইল ইউনিয়নের মুরইল মিয়াপাড়ার বাতাসে তখন এক অন্যরকম প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে পড়ে।
দুই বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা সবুজে ঘেরা একটি খামারবাড়ির প্রবেশমুখে চোখ পড়তেই মনটা জুড়িয়ে যায়। নামফলকে লেখা “নিহা খামার বাড়ি”।
ভেতরে ঢুকতেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক জীবন্ত গ্রামীণ স্বপ্ন। এক পাশে নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে একদল ছাগল। অন্য পাশে ডানা মেলে উড়ছে শৌখিন কবুতর। হাঁসের দল খেলা করছে আপন মনে, আর পাশের জলাশয়ে কই মাছের ছুটোছুটি।
এই নান্দনিকতার মাঝেই হঠাৎ নজর কাড়ে রাজকীয় চেহারার এক তোতাপুরী জাতের ছাগল। মুখটা সামান্য হাঁ করে আলতো করে জিহ্বা বের করে রাখাটাই তার স্বভাব। আর এই ভঙ্গিই তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। খামারের সবার আদরের এই ছাগলের নাম ‘জিহ্বা তোতা’। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন তার দিকে।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ ২৫ বছরের এক নীরব সংগ্রামের গল্প। খামারের প্রতিটি ইট, প্রতিটি ঘাস, প্রতিটি প্রাণীর সঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের ঘাম, কষ্ট আর স্বপ্নের ইতিহাস। তিনি মো. আরিফুল সরকার আরিফ (৪০)। মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকার একটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল থেকে যিনি আজ গড়ে তুলেছেন লাখ টাকার সফল খামার।
এই সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনীতে ‘গবাদি প্রাণী, পোষা প্রাণী ও সৌখিন পাখি’ ক্যাটাগরিতে বিশেষ সম্মাননা ও পুরস্কার পান তিনি। সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সপ্তাহেও অর্জন করেছেন বিশেষ সম্মাননা। এছাড়া খামার পরিচালনায় অনন্য অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই খামারি।
শখের শুরু, স্বপ্নের জন্ম:
২০০০ সাল। এসএসসি পাস করার পর জীবনের সুনির্দিষ্ট কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না আরিফ। ব্যবসা, কৃষিকাজসহ নানা কাজ করেও মন বসছিল না কোথাও। ঠিক সেই সময় শখের বশে কিনে ফেলেন একটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।
সেই শুরুর দিনের কথা মনে করে আরিফ বলেন, “শুরুতে একা একটি ছাগল খুব ছটফট করত। নানা অবাধ্যতা করত। মনে হতো বড় ঝামেলায় পড়েছি। কিন্তু কিছুদিন পর ওটা একদম পোষ মেনে গেল। যখন মমতা নিয়ে আমার হাত চাটত, তখন থেকেই মনে এক ধরনের আশা তৈরি হয় আমাকে বড় খামারি হতেই হবে।”
২০০০ সালে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় তার। জায়গা না থাকায় বাড়ির আঙিনাতেই চলত ছাগল পালন। একেকটি ছাগল বিক্রির টাকা জমিয়ে জমি কেনা, সেই জমিতে উন্নত জাতের ছাগল আনা এভাবেই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে খামার। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন খামার ঘুরেছেন তিনি।
সুবাসের পেছনে লুকিয়ে থাকা অবহেলা:
আজ যে খামার নিয়ে এত গর্ব, একসময় সেই ছাগল নিয়েই মানুষের কটূক্তি শুনতে হয়েছে আরিফকে।ছাগল নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটলে অনেকে নাক চেপে ধরত। কেউ কেউ মুখে কাপড় দিয়ে বলত, “ছাগলের গন্ধ আসে!”সেই অপমান বুকের ভেতর চেপে রেখেই আরিফ ভাবতেন,“মানুষ যেটাকে গন্ধ বলে নাক কুঁচকায়, ওটাই আমার জীবনের সুবাস।”তবে পরিবার কখনো তার পাশে থেকে সরে যায়নি। বিশেষ করে তার স্ত্রী ছিলেন এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নেপথ্যের কারিগর: এক সংগ্রামী স্ত্রীর গল্প বিস্ময়কর হলেও সত্য এত বড় খামারে কোনো বেতনভুক্ত কর্মচারী নেই। আরিফ ও তার স্ত্রী— এই দুই জোড়া হাতই পুরো খামারের একমাত্র ভরসা।
আরিফের পৈতৃক বাড়ি বগুড়া সদরের ১৫ নং ওয়ার্ডের গোদারপাড়া পশ্চিমপাড়া এলাকায়। সেখান থেকে কাহালুর মুরইল মিয়াপাড়ার এই খামারের দূরত্ব প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিন এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই সংসার ও খামার দুটো সামলান তিনি।
সকালে বাড়ির সব কাজ শেষ করেন। রান্না করেন। ছোট মেয়েকে খাইয়ে স্কুলে পাঠিয়ে স্বামীর জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে ছুটে আসেন খামারে। এরপর শুরু হয় ছাগলদের দেখভাল, খাবার দেওয়া, ঘর পরিষ্কারসহ খামারের সব কাজ।রাতের রান্নাটাও অনেক সময় খামারের এক কোণে বসেই করেন তিনি। স্বামীকে খাইয়ে মেয়ের জন্য রাতের খাবার নিয়ে সন্ধ্যায় আবার ফিরে যান বাড়িতে।
এই ত্যাগের গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “শুরুর দিকে খুব ভয় করত, যদি লোকসান হয়! ছাগল অসুস্থ হলে বুকটা কেঁপে উঠত। এখন এই ছাগলগুলো আমাদের সন্তানের মতো। প্রতিদিন এত দূর যাতায়াত করা কষ্টের, কিন্তু খামারের দিকে তাকালে সব ক্লান্তি ভুলে যাই। এই খামারের আয় দিয়েই বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়েটা এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। আমাদের যা কিছু— বাড়ি, গাড়ি, সম্মান— সবই এই খামারের জন্য।”
মহামারী আর মৃত্যুর কালো দিন:
২০২০ সালের করোনা মহামারী ছিল খামারের সবচেয়ে কঠিন সময়। লকডাউনে বাজার বন্ধ। ছাগল বিক্রি নেই। অথচ প্রতিদিন খাবার ও চিকিৎসার খরচ বেড়েই চলছিল। সংসার টিকিয়ে রাখাই তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।এরপর ২০২৫ সালে আসে আরও বড় ধাক্কা। খামারে হঠাৎ অজ্ঞাত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোখের সামনেই মারা যায় খামারের সবচেয়ে উন্নত জাতের একটি বড় ছাগল ও একটি বাচ্চা।সেই স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় আরিফকে। তবে বগুড়া পশু হাসপাতালের চিকিৎসা ও পরামর্শে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান তিনি।
এখন খামারেই বসে লাখ টাকার বাণিজ্য:
বর্তমানে ‘নিহা খামার বাড়ি’তে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার দেওয়া হয় ছাগলগুলোকে। দুপুরে নিজের জমিতে উৎপাদিত সবুজ নেপিয়ার ঘাস, আর সকালে ও সন্ধ্যায় দানাদার খাদ্য। খরচ কমাতে নিজের ১০ থেকে ১৫ টি কাঁঠাল গাছের পাতাও ব্যবহার করা হয়।
জাত উন্নয়নের জন্য নিয়মিত ক্যালসিয়াম, জিংক, মাল্টিভিটামিন ও লিভার টনিক দেওয়া হয় ছাগলগুলোকে। এখন আর আরিফকে হাটে গিয়ে ছাগল বিক্রি করতে হয় না। নাটোর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা সরাসরি তার খামারে এসে বাচ্চা কিনে নিয়ে যান। কিছুদিন আগেই তার খামারের একটি ‘হরিয়ানা’ জাতের ছাগল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার টাকায়।
সরকারি স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন:
বগুড়া সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা আরিফের এই সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. রায়হান বলেন, “আমরা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে আরিফকে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়েছি। খামার ব্যবস্থাপনা, খাদ্য, পানি ও ভ্যাকসিন বিষয়ে নিয়মিত সহায়তা করেছি। যার ফলেই তিনি ধারাবাহিকভাবে সফলতা ও সম্মাননা অর্জন করছেন। আরিফ এখন তরুণদের জন্য জীবন্ত উদাহরণ। যারা নতুন উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের বলব— কারিগরি জ্ঞান ছাড়া অন্ধভাবে খামার শুরু করবেন না। আগে প্রশিক্ষণ নিন, তারপর পরিকল্পনা করে এগিয়ে যান।” বাংলাদেশকে আত্মকর্মসংস্থানে বলীয়ান করতে বেকার সমস্যা সমাধানে ও প্রান্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য এই প্রাণী সম্পদের স্বল্প বিনিয়োগের টেকসই খাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে ।
শাইখ সিরাজের সঙ্গে দেখা করার স্বপ্ন:
অল্প শিক্ষিত হলেও আজ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আরিফ। নিজের কার গাড়িতে করে যখন ছাগলগুলোকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান, গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।হাসিমুখে তিনি বলেন,
“খামারই আমার সব। এই খামারের জন্যই আজ বড় বড় মানুষের সঙ্গে বসতে পারি। কখনো হতাশ লাগে না।”এখন তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন— খামারটিকে আরও বড় করা, বিভিন্ন উন্নত জাত এনে একটি প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
তবে আরেকটি স্বপ্ন আছে, যা পুরোপুরি আবেগের।একবারের জন্য হলেও দেশের জনপ্রিয় কৃষি ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের সামনে বসে নিজের ২৫ বছরের সংগ্রামের গল্প শোনাতে চান তিনি।
নতুনদের উদ্দেশ্যে আরিফের বার্তা, “চাকরির পেছনে না ছুটে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোট পরিসরে শুরু করুন। শুরুতে শ্রমিকের ওপর নির্ভর করবেন না, নিজে পরিশ্রম করুন। এই খাতে শ্রম দিলে লোকসানের সুযোগ খুব কম।”
বগুড়ার আরিফ ও তার স্ত্রীর ‘নিহা খামার বাড়ি’র গল্প যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় সততা, ধৈর্য, ভালোবাসা আর নিরলস পরিশ্রম থাকলে একটি ছোট্ট ছাগলও বদলে দিতে পারে পুরো জীবনের গল্প।
ভোরের আকাশ/ র.ই