বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে মানববন্ধন

বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আউটসোর্সিং ও কন্ট্রাক্টরনির্ভর নিয়োগ প্রথা বাতিল এবং শ্রম আইন অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
সোমবার (১০ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি আব্দুর রহিম। সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত।
তপন দত্ত বলেন, গত প্রায় সাড়ে চার দশকে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বিপুলসংখ্যক মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এ খাতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা করলেও তাদের বড় একটি অংশ ন্যায্য মজুরি ও শ্রম আইনে স্বীকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতে মজুরি বোর্ড থাকলেও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য এখনো কোনো মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়নি। এ খাতের শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
তপন দত্ত আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে ৪-৫ হাজার টাকা বেতনে একজন শ্রমিকের পক্ষে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা কঠিন। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। অথচ বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রমিক-কর্মচারী এখনো নামমাত্র বেতনে কাজ করছেন। এই বৈষম্য বন্ধে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক, ছুটি, ওভারটাইম ভাতা, উৎসব বোনাস, ভবিষ্যৎ তহবিল ও বিমাসহ শ্রম আইনে নির্ধারিত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হলেও অতিরিক্ত সময়ের জন্য আইনানুগ পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব অনিয়ম বন্ধে শ্রম অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
ইফতেখার কামাল খান আরও বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ এইড নার্স ও টেকনিশিয়ানদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শ্রমিকদের অধিকার হরণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কন্ট্রাক্টর ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় শ্রমিকেরা নামমাত্র মজুরি পাচ্ছেন এবং শ্রম আইনে প্রাপ্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই কন্ট্রাক্টর ও আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটের সময় বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা করেছেন। অথচ তাদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু, সংগঠনের সাবেক সভাপতি বিকাশ বসু, কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটার্স কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. পারভেজ, হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হানিফ, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি আনিসুর রহমান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা বিপ্লব চক্রবর্তী, সুপর্ণা বড়ুয়া, মোকাদ্দেসা খানম, আকতার হোসেন ও মিঠুন বড়ুয়াসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
পরে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা লাল পতাকা মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। সেখানে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
ভোরের আকাশ/সু.পা