সাবধান! পেঁপে না-কি বিষ খাচ্ছেন, জানেন তো আপনি

তেলা গা, রংও উজ্জ্বল। বিক্রেতার কথামতো ভালো ভেবে পাকা পেঁপে কিনলেন। বাড়ি এসে কেটে মুখে দিতে গিয়ে বুঝলেন বেমালুম ঠকে গিয়েছেন। না আছে স্বাদ, না মিষ্টত্ব। মুখে দিলেই বোঝা যায়, রাসায়নিক দিয়ে তা পাকানো হয়েছে। দেখে পাকা এবং সুস্বাদু হবে বলে মনে হলেও অনেক সময় মিষ্টি পেঁপে চেনা কঠিন হয়ে যায়। ফল খাদ্য ও পুষ্টির একটি অন্যতম উৎস।
কিন্তু একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী, মুনাফালোভী ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে ফল পাকিয়ে ফলের খাদ্যমান বিনষ্ট করছে। আম ও কলা বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে হলুদ রং করে পাকা বলে বিক্রি করার প্রচলন দীর্ঘদিন হলেও এবার বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে হলুদ রং করা পেঁপে। কাঁচা ও অপরিপক্ব পেঁপে বিক্রি করা হচ্ছে পাকা বলে। বড় বড় সাইজের এসব পেঁপে দেখে মনে হবে একদম গাছ পাকা।
বোটাগুলো একদম কাঁচা। মনে হয় পাকা পেঁপেগুলো এই মাত্র গাছ থেকে পেড়ে আনা হয়েছে। তবে সুস্বাদু ও মিষ্টি বলে কিনে ঠকছেন সাধারণ ক্রেতারা। পাকা হলুদ রঙের এসব পেঁপের ভেতরে বিচিগুলো একদম সাদা। হলুদ দেখালেও পেঁপেগুলো খেতে একদম পানসে ও স্বাদহীন। এই অপরিপক্ক ও কাঁচা পেঁপে হলুদ ও পাকা রং করতে গাছে থাকা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রতিটি পেঁপের বোটায় ঢোকানো হচ্ছে এক ধরনের বিষাক্ত কেমিক্যাল। ইনজেকশন দেওয়ার দু-একদিনের মধ্যেই কেমিক্যালের প্রভাবে কাঁচা পেঁপেগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে হলুদাভ রং ধারণ করছে। বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকা রং করা এ ধরনের ফল খেলে শরীরের দৃষ্টি শক্তি হারানো, কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এই ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রিত পেঁপে বিক্রি করা হয়। ঢাকার বড় ফলের বাজার থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো পেঁপে বিক্রি করেন। রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় স্টেডিয়ামের প্রবেশমুখে, পল্টন মোড় পেঁপে নিয়ে বসেন রহিম উদ্দিন ও কবিরুল ইসলাম।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়ত থেকে টকটকে হলুদ রঙের এই পেঁপে কিনছেন চড়া দামে। এখন ভালো না খারাপ এটা তারা জানেন না। কিন্তু খাবার পর পেঁপে মিষ্টি স্বাদযুক্ত নয় বলে অনেকে অভিযোগ করেন। ইনজেকশনের মাধ্যমে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো এই পেঁপে কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন শহরের অনেকেই। এমন একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা সামলুল আলম।
তিনি ভোরের আকাশকে বলেন, গাছ পাকা পেঁপে বলে কিনে বাড়িতে নিয়ে তারা খেতে পারেননি। পেঁপে কেটে দেখা গেছে পেঁপের ভেতরে বিচিগুলো একদম ধবধবে সাদা ফুলো পেঁপের মতো। পেঁপে শক্ত ও কচকচে। ভিতরের রং অনেকটা গাজরের মতো। কোনো স্বাদ নেই। নরম হওয়ার জন্য বাসায় রাখা হলেও কয়েকদিনের মধ্যে এই পেঁপে থেকে এক ধরনের পচা বোটকা গন্ধ বের হচ্ছে।
কার্বাইড কী, কিভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় : ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ ভোরের আকাশকে বলেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। এটি এক ধরনের যৌগ যা বাতাসে বা জলীয় সংস্পর্শে এলেই উৎপন্ন করে এসিটিলিন গ্যাস। যা ফলে প্রয়োগ করলে এসিটিলিন ইথানল নামক বিষাক্ত পদার্থে রূপান্তরিত হয়। কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল খেলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি নানা রকম রোগে বিশেষ করে বদহজম, পেটেরপীড়া, পাতলা পায়খানা, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যানসারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। এছাড়া মহিলারা এর প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারে। শিশুরা বিষাক্ত পদার্থের বিষক্রিয়ার ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফলের স্বাদ নিয়ে ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ বলেন, কার্বাইড বিক্রিয়ায় ফলকে কাঁচা থেকে পাকা অবস্থায় নিয়ে আসে। ফলটি কাঁচা, কিংবা আধাপাকা অবস্থায় থাকুক না কেন কিছু কিছু ফলের বাইরে এবং ভেতরে কেমিক্যালের প্রভাব এতটাই ঘটে যে, ভেতরে বাইরে ফলটির রঙে ও স্বাদে স্বাভাবিকভাবে পাকা ফলের মতো হয়ে যায়। কোনো কোনো ফলের বেলায় কেবল তার বাহ্যিক বর্ণ আকর্ষণীয় হয়ে পড়ে।
স্বাভাবিক পাকা ফলের মতো দৃষ্টি নন্দন টকটকে লাল, হলুদ, গোলাপি বর্ণ দেখে মানুষ আগ্রহ করে এসব কৃত্রিমভাবে পাকানো ফল পছন্দ করে কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ক্রেতা হয়তো জানেন না যে, তিনি টাকা দিয়ে বিষ কিনলেন। এতে একদিকে যেমন ফলের পুষ্টি গুণাগুণ নষ্ট হয় অপরদিকে ফল খেতে বিস্বাদ, পানসা, শক্ত ও তেতো স্বাদযুক্ত মনে হয়।
কৃত্রিমভাবে পাকানো ফল চেনার উপায় : পেঁপে. টমেটো, আম, ইত্যাদি ফলকে কৃত্রিমভাবে পাকানো হলে ফলত্বক সুষম রং ধারণ করে। কলার ক্ষেত্রে ফলত্বক হলুদ বর্ণের থাকলেও কান্ডের অংশ গাঢ় সবুজ রঙের থাকে বলে জানান তিনি।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক মো. মসীহুর রহমান বলেন, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় ভোক্তা আইন আরও কঠিনভাবে প্রয়োগের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে জেল-জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এরপরও অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টানা যাচ্ছে না। তবে আগের তুলনায় কমেছে।
জনসাধারণকে সচেতন করতে সংবাদপত্র, রেডিও, টিভিতে ব্যাপক প্রচার করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফল, শাক-সবজি ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ রোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। সার্বিকভাবে ভোক্তা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতার মাধ্যমেই ভেজালমুক্ত ফলমূল খেতে পারবো এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে করেন তিনি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ