বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, ৪১ জেলায় নেই পরীক্ষার সুযোগ

ছবি: সংগৃহীত
হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় যখন সারা দেশে নাকাল তখনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মরণঘাতী এইচআইভি/এইডস সংক্রামণ। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিএমএ ভবনে এইচআইভি সংক্রমণ বিষয়ক এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ)-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এইচআইভি/এইডস সংক্রামণ বিষয়ক এক কর্মশালায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।
তারা বলেন, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে, বিশেষ করে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি এখন রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে প্রতি বছর ১০, ২০, ১০০ বা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা।
এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২০০০ সালে। ২০২৫ সালে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৪ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। তিনি জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার ০.০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন, যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, ৬ শতাংশ শিরায় মাদকগ্রহণকারী, এবং নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকে ১ শতাংশ। এছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য শ্রেণির মানুষ।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৬২.৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১.০৫ শতাংশ, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ০.৬৯ শতাংশ এবং ৫ বছরের কম বয়সী ১.৯৬ শতাংশ।
কর্মশালায় ‘এইডস রিপোর্টিং: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি। তিনি বলেন, একসময় শিরায় মাদকগ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে ২০২০ সালের পর থেকে সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়ছে এবং তারা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে প্রবাসী শ্রমিকরা।
কর্মশালায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে হেয় বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ায়।তিনি আরও বলেন, “স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে আড়ালে ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়।”
অধ্যাপক মুন্সী জানান, কোনো রোগীকে তার রোগের কারণে চিহ্নিত বা ‘ট্যাগ’ করা স্টিগমার অন্তর্ভুক্ত। আর অসুস্থতার কারণে কাউকে চাকরি বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি বলেন, এইচআইভি এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয়। সঠিক চিকিৎসায় এটি ডায়াবেটিসের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
বর্তমানে এমন ইনজেকশনও রয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজ এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।
ভোরের আকাশ/সু.পা



