বিশেষ

বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর হুমকি, জুনেই ৬ জনের মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গু আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ় শুরু হতে এখনো কয়েক দিন বাকি থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই এইডিস মশাবাহিত এ রোগে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৮ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৩ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ জন রোগী।

এ অবস্থায় রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১২ হাজার ১৪ জন আক্রান্ত এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৮ হাজার ৬১ জন আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে সারা বছরব্যাপী একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এ কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন—ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন—মশকনিধনে বড় বাজেট ও কার্যক্রম চালালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মশক নিয়ন্ত্রণ খাতে ব্যয় বছরে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। শুধুমাত্র ডিএনসিসির বাজেট ২০১৯–২০ অর্থবছরের ৪৯.৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৮৭.৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে ডিএসসিসির বাজেটও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে সর্বশেষ ৫৭.৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কবিরুল বাশার (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে এইডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত বাড়ে। একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর বিস্তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, জলাবদ্ধতা ও খোলা ড্রেনেজ ব্যবস্থাই মশার প্রজননের বড় কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফগিং কার্যকর সমাধান নয়। এটি মূলত দৃশ্যমান কার্যক্রম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। তাদের মতে, কার্যকর সমাধান হলো এইডিস মশার লার্ভা ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রবে চরম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। কোথাও ফগিংয়ের কয়েক মিনিট পরই আবার মশা দেখা যাচ্ছে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানি জমে থাকা ও ড্রেনেজ সমস্যায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, প্রতিবছরই মশকনিধন কার্যক্রম চললেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

ডিএসসিসির প্রধান কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে ব্যবহৃত কীটনাশক কার্যকর হলেও মশা শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নাগরিকদের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর হুমকি, জুনেই ৬ জনের মৃত্যু | স্বাস্থ্য কথা