মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাধা সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্য: সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা

ছবি: সংগৃহীত
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে এর সমন্বয়, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক সহায়তা, মানবিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও যুক্ত করতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছিল। তাদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয়নি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ: আ পাথওয়ে টু ইনক্লুসিভ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে আঁচল ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি), লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) ও পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থা (রুডো)।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, সামাজিক কুসংস্কার, সচেতনতার অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাবে অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মনোবিজ্ঞানী না থাকায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত মানসিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক হলে চলবে না। প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে পুনঃএকীভূতকরণের সমন্বয়ে কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত কেন্দ্রে রেফারেল সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কার্যকর জনবল কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এইচআরডিসির পরিচালক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. জিয়ানুর কবির। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদা ও সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের দোরগোড়ায় এ সেবা পৌঁছে দিতে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন জিয়ানুর কবির। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে তিনি পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলো হলো—নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ট্রমা-সচেতন মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ ও পদায়ন, কমিউনিটিভিত্তিক ট্রমা-সচেতন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা।
প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুধু বিশেষজ্ঞ বা স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে এ বিষয়ে সচেতনতা এবং কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার তৈরির পাশাপাশি মা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুজন কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগের সুপারিশ করেন।
সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা বলেন, শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক কষ্ট, ভয়, উদ্বেগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রেও পেশাদার সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মানসিক কষ্টের কথা বলতে পারবেন, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিতে পারবেন এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারবেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান। এ সময় আরও বক্তব্য দেন আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিচালক সোহেল মামুন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজির সহকারী অধ্যাপক মুস্তাইম বিল্লাহ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক অধ্যাপক মো. দাউদ, রুডোর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. শামীম রেজা, ডিগনিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার রোজেন, সোসাইটি ফর হেলথ প্রমোশন লিংকসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. হালিদা হানুম আখতার এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক আহসান উদ্দিন।
ভোরের আকাশ/সু.পা



