বয়স্কদের হাম সংক্রমণ বাড়ছে

ছবি: সংগৃহীত
ঝর্ণা আক্তার (৩৫) হামে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে পঞ্চম তলায় ভর্তি আছেন। রামপুরার বাসিন্দা ঝর্ণা গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ ১০৩ ডিগ্রি জ্বর, মাথাব্যথা ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হন। একদিন পরই তার শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। প্রথমে তিনি এটিকে অ্যালার্জি ভেবেছিলেন। কিন্তু পুরো শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়া এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ায় গত শনিবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, তিনি হামে আক্রান্ত।

একই ফ্লোরের ২৯ নম্বর বেডে পাঁচ দিন ধরে ভর্তি আছেন ২১ বছর বয়সী মো. সোহেল। রাজধানীর শনিরআখড়ার এই সিএনজি মিস্ত্রির শরীরজুড়ে র্যাশ ছড়িয়ে পড়েছে। বড় বোন রুমি আক্তার তাকে সেবা দিচ্ছিলেন। সোহেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাইটা গতকাল থেকে খুব অসুস্থ। শরীরে র্যাশের কারণে ভীষণ চুলকাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয়, গত তিন দিন ধরে সে চোখ খুলতে পারছে না। দুই চোখ পুরো লাল হয়ে গেছে। ডাক্তার চোখের ওষুধ দিয়েছেন, কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না।’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ঝর্ণা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম অ্যালার্জি। পরে জ্বর ও দুর্বলতা বাড়লে হাসপাতালে আনা হয়। আনার সময় আমার জ্ঞান ছিল না বলেই শুনেছি।’ পরিবারের কারও আগে হাম হয়েছিল কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার এক ভাগ্নির হাম হয়েছিল। সে সুস্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে একদিন বক্ষব্যাধি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এর পরদিনই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।’
একটু দূরেই চিকিৎসাধীন আছেন ৩২ বছর বয়সী মানিক হোসেন ও ২৯ বছর বয়সী আব্দুস সালাম। সাভার থেকে আসা মানিককে গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি করান তার স্ত্রী সুলতানা বেগম। তিনি বলেন, ‘গত বুধবার থেকে তার প্রচণ্ড জ্বর ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়। এনাম মেডিকেলে নেওয়ার পর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তারা এখানে পাঠিয়ে দেয়। এখনও জ্বর ও পাতলা পায়খানা রয়েছে। শরীর এতটাই দুর্বল যে তিনি বসে থাকতে পারছেন না।’

অন্যদিকে, আব্দুস সালামের ভাই আল আমিন জানান, ‘বৃহস্পতিবার থেকে ভাইয়ের প্রচণ্ড জ্বর। গাজীপুরের তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজে নেওয়া হলেও উন্নতি না হওয়ায় এখানে আনা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে ভাই চোখ খুলতে পারছে না এবং কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পঞ্চম তলায় ৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ১২০ জন হাম রোগী ভর্তি আছেন। এছাড়া চতুর্থ তলায় ২ থেকে ৮ বছর বয়সী ১০৯ জন শিশু এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুই বছরের কম বয়সী ৩০৩ জন শিশু হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন।
বয়স্ক ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, এখানে ৩০ বছরের বেশি বয়সী অনেক রোগী আছেন। বর্তমানে হামের জন্য ৯ ও ১৫ মাস বয়সে যে এমআর টিকা দেওয়া হয়, তা এই বয়সী ব্যক্তিরা শৈশবে পাননি, কারণ তখন এই টিকার প্রচলন ছিল না। তবে এমন অনেক রোগীও পাওয়া যাচ্ছে, যারা হামের দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন। টিকা নেওয়ার পরও কেন তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। তাদের প্রাথমিক ধারণা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় এরা সহজে আক্রান্ত হচ্ছেন।
হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ১৫ মাস বয়সী শিশু সাইফকে নিয়ে চার দিন ধরে ভর্তি আছেন তার মা আছিয়া আক্তার। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে সব টিকা দেওয়া হয়েছে। এই মাসেই ১৫ মাস পূর্ণ হয়েছে, আরেকটি টিকা নেওয়ার তারিখ ছিল। কিন্তু হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার থেকে জ্বর ও কাশি শুরু হয়। একদিন পর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। মিডফোর্ড হাসপাতালে নেওয়ার পর বলা হয়, বাচ্চার হাম হয়েছে—সেখান থেকে এখানে পাঠানো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তার নিউমোনিয়া নেই—শুধু জ্বর, কাশি ও হাম। দুই দিন ধরে কিছু খেতে পারছে না। আশপাশে কারও হাম হওয়ার খবরও পাইনি, আর গত দুই সপ্তাহে তেমন বাইরে যাইনি। তবুও কেন এমন হলো, বুঝতে পারছি না।’
দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এমন রোগী আছে, যারা এক বা দুই ডোজ এমআর টিকা নিয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্তদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। হাম-সন্দেহে ২ হাজার ৩১০ জন শিশুর ওপর চালানো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদের মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকাই নেয়নি। ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ (এমআর-১) নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর ২৩.২ শতাংশ শিশু পূর্ণ দুই ডোজ (এমআর-১ ও এমআর-২) নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে।
এছাড়া নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭১.৮ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি (এর মধ্যে ৪৯ শতাংশের টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি)। ১৭ শতাংশ শিশু এক ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে এবং ১১.২ শতাংশ শিশু পূর্ণ টিকাদান সম্পন্ন করার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



