ডেঙ্গু-হাম-চিকুনগুনিয়াসহ একাধিক ভাইরাসে ঘরে ঘরে জ্বর

ছবি: সংগৃহীত
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ একাধিক ভাইরাসের সংক্রমণে ঘরে ঘরে বাড়ছে জ্বরের প্রকোপ। এর সঙ্গে রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। ফলে জ্বরকে এখন আর সাধারণ উপসর্গ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের শরীরে একাধিক ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়ায় রোগী ও স্বজনদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফল হাতে না আসা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা সুলতানা বেগম (৩৩)। পেশায় শিক্ষিকা। দুই বছরের শিশু সন্তান আরাফকে নিয়ে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এসেছেন তিনি। সুলতানা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে রাতের দিকে আরাফের জ্বর আসছে। ডেঙ্গু বা হামে আক্রান্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।
আরাফের মতো অসংখ্য শিশুকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষা করছেন অভিভাবকেরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমবেশি সবার ঘরেই একাধিক ব্যক্তি জ্বরে আক্রান্ত। ঘরোয়া চিকিৎসায় জ্বর না কমায় বাধ্য হয়ে হাসপাতালে এসেছেন তারা।
পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা হিমেল চৌধুরী জানান, তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজনই জ্বরে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, তিনি যে ছয়তলা ভবনে থাকেন, সেই ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটেই দু-একজন করে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর না কমায় উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানান তিনি।
রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, মাসখানেক আগেও প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে ২৫০ জন রোগী আসতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, বেশির ভাগ শিশু জ্বর, শরীরে র্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসছে। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষায় শনাক্ত না হলেও তাদের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশকে ভর্তি করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। হাম মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও দুটি রোগই শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের সময় শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, হামের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বরের পর র্যাশ শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চোখের পেছনে, মেরুদণ্ডসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। মৌসুমি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের তীব্র ব্যথা থাকে না। ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ ও শকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। হামের বড় জটিলতা নিউমোনিয়া। আর ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ থাকার প্রবণতা বেশি। অর্থাৎ জ্বর একই উপসর্গ হলেও রোগ এক নয়। আর এখানেই চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
ঘরে ঘরে জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা বর্তমানে প্রধান কারণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি—দুটিই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শনাক্ত হচ্ছে। ঘনবসতির কারণে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জ্বরের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনও পুরোপুরি কমেনি। পাশাপাশি হাম ও চিকুনগুনিয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও শরীরের ব্যথা সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্থায়ী হচ্ছে।
তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে তীব্র ব্যথা হওয়ায় হাঁটা-চলায় সমস্যা হতে পারে। কারও কারও চোখ-মুখ ফুলে যেতে পারে। জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া কিংবা ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা শুরু করা বিপজ্জনক। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে এলে চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হয়ে যায়। তাই জ্বর হলে রোগের বিষয়ে সচেতন ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই মিলিয়ে গত ছয় মাসে ৯৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১ হাজার ৪৩ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে ৯৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জনে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭২ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৮ জনে। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৯৬।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যায় নতুন রেকর্ড হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন রোগীদের নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৯০ জনে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারাদেশে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নারী ও ৫২ জন পুরুষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরের জুনে সারাদেশে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। গত মাস অর্থাৎ আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। আর চলতি মাসে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৪৪ জনে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



