বিশেষ

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট ওষুধ বা কার্যকর ভ্যাকসিন এখনো নেই: অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ

ছবি: সংগৃহীত

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই এর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ বা টাইফয়েডের মতো কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শনিবার (৪ জুলাই)‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, আগে ডেঙ্গু রোগীদের প্লাটিলেট বা রক্ত দেওয়ার প্রবণতা ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতো। তিনি বলেন, শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে গেলেই প্লাটিলেট দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। একইভাবে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয় তখনই, যখন রোগীর রক্তক্ষরণ হয় বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলেই কেবল রক্ত বা প্লাটিলেট দেওয়া উচিত।

তিনি জানান, আগে এক ইউনিট প্লাটিলেট সংগ্রহে অন্তত চারজন রক্তদাতার প্রয়োজন হতো। এতে দালালচক্র সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভির মতো সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ত। তবে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে অপ্রয়োজনীয় প্লাটিলেট দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণার কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, অনেকেই পেঁপের পাতা, বিভিন্ন ভেষজ উপাদান বা তাবিজের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এসব পদ্ধতির কার্যকারিতার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তিনি বলেন, ‘অনেকে জানতে চান, পেঁপের পাতা খাওয়া যাবে কি না। আমি বলি, এতে ক্ষতি না হলে খেতে পারেন। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটি ডেঙ্গু সারায়—এমন কোনো প্রমাণ নেই। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। এ রোগের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক ও সহায়ক।’

ভ্যাকসিন এখনো সবার জন্য নয়
অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে কয়েকটি ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছে। ফ্রান্স ও জাপানের কিছু ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখনো এমন কোনো ভ্যাকসিন আসেনি, যা সবার জন্য নিয়মিত প্রয়োগ করা যাবে। তাই ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো আরও জোরদার করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে কয়েক দিন উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পর জটিলতা দেখা দিলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

তার ভাষ্য, এখন অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বরও থাকে না। তাই ডেঙ্গুর মৌসুমে যে কারও জ্বর হলে তা অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। জ্বর শুরুর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সমন্বিত উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। পাশাপাশি জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

গোলটেবিল আ আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ।

ভোরের আকাশ/সু.পা

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট ওষুধ বা কার্যকর ভ্যাকসিন এখনো নেই: অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ | স্বাস্থ্য কথা