হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় বিপদ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া

ছবি: সংগৃহীত
দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও, হামের পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে শিশুরা এখনো হাসপাতালে আসছে। চিকিৎসকদের মতে, এসব শিশু অধিকাংশই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে হামের পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সুস্থ হতে তাদের সময়ও বেশি লাগছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের পর শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে তারা সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় মারা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং ৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে মৃত্যুর সংখ্যা ২৬৩ জন। সব মিলিয়ে গত ৫১ দিনে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে যেসব রোগী আসছে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রেফার হয়ে আসা জটিল রোগী। হামের কারণে শিশুরা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হামের পর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমে যাওয়ায় তারা সহজেই সংক্রমিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকও কার্যকর হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই নিউমোনিয়ার কারণে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসও মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা কাভারেজ কমে যাওয়া, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ বা ব্যাহত হওয়া, টিকা গ্রহণে অনীহা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এই প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। তাদের মতে, কোনো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ প্রয়োজন, কিন্তু দেশে তা অনেক কমে গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফায়সাল বলেন, হামের সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া হয় না; বরং কয়েকদিন পর এসব জটিলতা দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। তাই নতুন রোগী কমলেও শিশুমৃত্যুর প্রভাব আরও কিছুদিন থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশু সুস্থ হওয়ার পর অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ বিশেষ যত্নে রাখতে হবে। এ সময়ে শিশুকে আলাদা রাখা, মাস্ক ব্যবহার করানো এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়া জরুরি।
সরেজমিনে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটে বর্তমানে ৮৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কিছুটা কমলেও জটিল রোগীদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ এখনো বিদ্যমান।
প্রসঙ্গত, ইপিআই তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকাদান কাভারেজ ছিল মাত্র ৫৭.১ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। টিকা কাভারেজ কমে যাওয়ায় দেশ এখন হামের প্রাদুর্ভাব ও এর জটিলতার সঙ্গে লড়ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



