বিশেষ

• মৃত্যুহার বাড়ায় জনমনে উদ্বেগ • আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়ালো • হাসপাতালের করিডোরে বাবা-মায়ের হাহাকার • টিকার অভাব অসচেতনতায় বাড়ছে মৃত্যু : চিকিৎসক

হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, দিশেহারা স্বজনরা

ছবি: সংগৃহীত

হামের সংক্রমণ শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে । আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, হাসপাতালে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে।

তাঁদের মতে, হামের বিস্তারের টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতিই  প্রধান কারণ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ ছাড়া ঘনবসতি ও অপুষ্টির কারণেও ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার কারণে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে পাঁচ বছরের শিশু তানভীর হাসান। হাসপাতালে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় শিশুটির বাবা রাকিব আহমেদের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে শিশুটির খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। দুই দিন ধরে কথা-বার্তাও কমে গেছে। কত চঞ্চল ছিল আমার ছেলে! এখন ‘বাবা’ বলেও ডাকে না, কোনো কিছুই ভালো লাগে না।

তিনি বলেন, এখন সারাক্ষণ কান্না করে। তার কান্নার সঙ্গে আমাদের মনও ভারী হয়ে ওঠে। শুয়েও থাকে না, ঠিকমতো ঘুমও হয় না। একই অবস্থা তিন বছরের শিশু রাফিয়া আখতারের। জানতে চাইলে রাফিয়ার বাবা জিহাদ হোসাইন বলেন, দুই দিন জ্বর ছিল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়েছিলাম। ভাবছিলাম ভালো হয়ে যাবে, কিন্তু হয়নি। দিনে দিনে অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে ভালো চিকিৎসক দেখানোর পর জানতে পারি, রাফিয়ার হাম হয়েছে। এখন আমাদের প্রতিটি সময় কাটে চিন্তায়। পরিবারের ছোট মেয়ে সবার আদর-যত্নের ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং লক্ষণ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ১২৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জন। এর মধ্যে ৮৪৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৩৫৫ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে, আর সবচেয়ে কম সাতজন ভর্তি হয়েছে রংপুরে।

অধিদপ্তর জানায়, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪। এদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী টিকাদানের ঘাটতির কারণে ২০২৩ সালে ৫৭টি দেশে বড় বা গুরুতর হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এটি আগের বছরের ৩৬টি দেশের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আওতাধীন আফ্রিকান, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, ইউরোপীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই প্রাদুর্ভাবের প্রায় অর্ধেকই আফ্রিকা অঞ্চলে দেখা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। ইপিআইয়ের হিসাবে হাম-রুবেলার টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখ বা তার বেশি। ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশ শিশু টিকার প্রথম ডোজ এবং ৮১ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। চার-পাঁচ বছরে টিকা না পাওয়া বা অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সমান বা তার বেশি হয়েছে।

এদিকে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের আট বিভাগে এ পর্যন্ত ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৩ জন শিশু টিকা পেয়েছে। এ ছাড়া ১২টি সিটি করপোরেশনে টিকা পেয়েছে ৯ লাখ ৭৪ হাজার ২৪৭ জন শিশু।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান ঢাকা মেইলকে বলেন, সারাদেশে পুরোদমে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। আগামী মাসের ২০ তারিখের মধ্যে শতভাগ শিশু টিকার আওতায় আসবে। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেক শিশু মারা যাচ্ছে এবং অভিভাবকরাও এখন সচেতন হচ্ছেন। তারা নিজ উদ্যোগে খবর নিয়ে টিকা নিচ্ছেন এবং অন্যদেরও সচেতন করছেন।

তিনি বলেন, সরকারি ছুটির দিনে টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রের বাইরে নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা ও শিশু আশ্রমে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব শিশু স্কুলে যায় না কিংবা স্কুলে টিকা নেয়নি, তাদের কমিউনিটির নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে হামের টিকা দেওয়ার হার কমে গেছে। হাম থেকে বাঁচতে হলে টিকা দিতে হবে এবং অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মায়েদের মধ্যে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা কমেছে। ফলে শিশুর হামসহ নানা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এছাড়া বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় হামের জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুব আলম বলেন, জ্বর হলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। চোখ লাল হওয়া, নাকে সর্দি, কাশি এবং গায়ে অ্যালার্জির মতো র‍্যাশ উঠলে সেটিকে হাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না, সেটিও লক্ষ্য করতে হবে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক না হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি। হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ।

এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে এর কার্যকারিতা পাওয়া যায় না; দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো, এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে। মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করতে সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, দিশেহারা স্বজনরা | স্বাস্থ্য কথা | ভোরের আকাশ