বিশেষ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন :: সীমান্ত নিয়ে সতর্কতা

হামের উচ্চ ঝুঁকিতে দেশ

হামের উদ্বেগজনক বিস্তারের কারণে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে  শ্রবণশক্তি হ্রাস, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া এবং অন্ধত্ব; গুরুতর জটিলতার মধ্যে রয়েছে এনসেফালাইটিস, মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মৃত্যু।

গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধিমালা (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়ে অবহিত করে। তখন পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রতিবেদনে ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহভাজন হামের রোগী এবং ২ হাজার ৮৯৭ জন নিশ্চিত রোগীর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ে ১৬৬টি হামজনিত মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। মৃত্যুহার ০.৯%। রিপোর্ট করা ঘটনাগুলোর অধিকাংশই, অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ, ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।

বাংলাদেশে বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি জনসংখ্যার অপর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার প্রেক্ষাপটে ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয় টিকা নেয়নি অথবা হামের টিকার মাত্র একটি ডোজ গ্রহণ করেছে। এছাড়া কিছু শিশু ৯ মাস বয়সে টিকা গ্রহণের উপযুক্ত হওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে (৯১%) আক্রান্ত হয়েছে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা, যা এই বয়সীদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের দিকে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। ২০১২ সালে দেশব্যাপী কর্মসূচি চালুর পর থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ২২% থেকে ১২১%-এ উন্নীত হয়েছিল। একই সময়ে নিশ্চিত হামের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে দেশব্যাপী এমআর টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং ২০২০ সাল থেকে নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির অনুপস্থিতির কারণে এমআর১ ও এমআর২ কভারেজে সাম্প্রতিক হ্রাস ঘটে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।

একাধিক বিভাগজুড়ে চলমান সংক্রমণ, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি এবং হাম-সম্পর্কিত সন্দেহজনক মৃত্যুর কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে উচ্চ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। টিকা না নেওয়া ও আংশিক টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে, এমনকি টিকা দেওয়ার জন্য খুব ছোট শিশুদের মধ্যেও রোগের প্রকোপ বেশি হওয়ায় সংক্রমণ অব্যাহত থাকার এবং গুরুতর পরিণতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রাদুর্ভাব হাম নির্মূলের পথে বাংলাদেশের পূর্ববর্তী অগ্রগতির বিপরীত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয় এবং ধারাবাহিক সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে। নজরদারি জোরদার, দ্রুত রোগী শনাক্ত ও প্রতিকার এবং উন্নতমানের টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সীমান্ত নিয়ে সতর্কতা

সীমান্ত পারাপারের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো প্রধান শহরগুলো আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ট্রানজিট কেন্দ্র হওয়ায়, বিশেষ করে টিকা না নেওয়া বা অপর্যাপ্ত টিকা নেওয়া ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম একটি স্থানীয় রোগ, এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে ঝুঁকি উচ্চ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিস্তৃত স্থলসীমান্ত রয়েছে, এবং এই সীমান্তজুড়ে মানুষের চলাচল সংক্রমণ অব্যাহত রাখতে পারে। মিয়ানমারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক টিকাবঞ্চিত শিশু রয়েছে। চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে সেখানে নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা সীমিত। ভারতে উচ্চ টিকাদান কভারেজ থাকলেও গত ছয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকার সঙ্গে ভারতের ব্যস্ত স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা সীমান্ত পেরিয়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

হাম নির্মূলে অগ্রগতি সত্ত্বেও বর্তমান প্রাদুর্ভাব জনসংখ্যার দুর্বলতা ও টিকাদান কর্মসূচির ভঙ্গুরতা তুলে ধরেছে। জনসংখ্যার উচ্চ গতিশীলতা, চলমান সংক্রমণ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক ঝুঁকি মাঝারি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

হামের জটিলতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সব বয়সী সংবেদনশীল ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি (বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব রয়েছে এমন) এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি।

হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে শ্রবণশক্তি হ্রাস, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অন্ধত্ব। গুরুতর জটিলতার মধ্যে রয়েছে এনসেফালাইটিস, মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মৃত্যু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের মাধ্যমে কমপক্ষে ৯৫% টেকসই ও সুষম কভারেজ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সব সন্দেহভাজন রোগীকে সময়মতো শনাক্ত করার জন্য হাম ও রুবেলার সমন্বিত নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সীমান্তবর্তী জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, দ্রুত শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ, প্রশিক্ষিত দল সক্রিয় রাখা এবং প্রোটোকল বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে।

প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধে যথাযথ রোগী ব্যবস্থাপনা, আইসোলেশন এবং অন্যান্য রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—যেমন স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যটন ও পরিবহন খাতের কর্মী এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ টিকাদান পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্পর্শে আসা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য সংস্পর্শ-পরবর্তী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেমন এমসিভি ডোজ বা ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশু, গর্ভবতী নারী ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভ্রমণ বা বাণিজ্যের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন নেই।

ভোরের আকাশ/সু.পা

হামের উচ্চ ঝুঁকিতে দেশ | স্বাস্থ্য কথা | ভোরের আকাশ