লবণাক্ত পানিতে বাড়ছে উপকূলের গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির ব্যবহার গর্ভবতী নারীদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লবণযুক্ত পানি পান উচ্চ রক্তচাপ ও প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই জটিলতা সময়মতো চিকিৎসা না হলে লিভার ক্ষতি, রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়া, কোমা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা। বাংলাদেশেও মাতৃমৃত্যুর শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া অন্যতম।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশুর জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক উন্নত দেশ এই লক্ষ্য অর্জন করলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশুর জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১৯৬ জন, যা প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানীয় জলের সরাসরি সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার হার বাড়ার পেছনে লবণাক্ত পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্যানেল আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন সুপেয় পানির সরবরাহ ও গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস পানির সংকটে ভোগে। বিশেষ করে নিচু বদ্বীপ অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানির উৎসে প্রবেশ করে সুপেয় পানির সংকট বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশেও উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিষ্টি পানির সংকট সবচেয়ে বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে।
মাতৃমৃত্যু ও প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার বর্তমান চিত্র
গত দুই দশকে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এই সাফল্যের অন্যতম কারণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অগ্রগতি ধীর হয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে মাতৃমৃত্যুর পেছনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, দূরত্ব, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া এবং অর্থনৈতিক সংকট বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাপী প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার হার কমলেও বাংলাদেশে এটি এখনো উদ্বেগের বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতার সম্পর্ক ছিল।
২০২১ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার হার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ পাওয়া যায়। উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত আরেক গবেষণায় এক হাজার ২০৮ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে ২০২ জন (১৬ দশমিক ৭ শতাংশ) প্রিক্ল্যাম্পসিয়া বা গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন।
কেন বাড়ছে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি?
প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তবে ধূমপান, স্থূলতা, পারিবারিক ইতিহাস, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপ এবং কিছু পুষ্টির ঘাটতিকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণও এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। লবণাক্ত পানিতে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম মানবদেহে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ায়, যা গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেন। এর ফলে শুধু প্রিক্ল্যাম্পসিয়া নয়, ডায়রিয়া, বমি ও বিভিন্ন চর্মরোগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
দরিদ্রতা ও সচেতনতার ঘাটতিও বড় সমস্যা
বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের। এসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক নারী গর্ভাবস্থার জটিলতার লক্ষণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পান না। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার অভাব ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নিরাপদ পানির ব্যবস্থা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া কমাতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। লবণাক্ততা দূরীকরণ প্লান্ট, পুকুরের পানি ফিল্টার (পিএসএফ) এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ—এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
এর মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর। পারিবারিক পর্যায়ে ৫০০ থেকে ১০০০ লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক স্থাপনে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলে অনেক পরিবার উপকৃত হতে পারে। পুকুরের পানি ফিল্টারও স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ পানির উৎস হতে পারে। তবে লবণাক্ততা দূরীকরণ প্লান্ট স্থাপন ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের জন্য তা বাস্তবসম্মত নয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/সু.পা



