বিশেষ

মাইক্রোপ্লাস্টিক আতঙ্ক, টুথপেস্ট ব্যবহারে করণীয়

ছবি: সংগৃহীত

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)। সংস্থাটির এক গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয়, শিশুদের জন্য বাজারজাত কয়েকটি টুথপেস্টেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত নদী-সমুদ্র দূষণের বিষয়টি সামনে আসে। কারণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নদী ও সমুদ্রে গিয়ে জমা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু জলাশয়ের সমস্যা নয়। বাতাস, পানি ও খাদ্যসহ প্রায় সব পরিবেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এমনকি মানুষের শরীর, হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কেও এর উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, প্রতিদিন ব্যবহৃত টুথপেস্টও কি মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশের একটি উৎস হতে পারে?

দাঁত ব্রাশ করার সময় কি মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁত ব্রাশ করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট গিলে ফেললে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে সুস্থ মাড়ি বা পেরিওডোনটাল লিগামেন্ট দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক শোষিত হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সাধারণত ব্রাশ করার সময় ব্যবহৃত টুথপেস্টের বেশির ভাগই থুতুর সঙ্গে বের হয়ে যায়। তবুও অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট গিলে ফেলা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। টুথপেস্টের মাধ্যমে মানবদেহে কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে এবং এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব কতটা—তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তবে গবেষকেরা সম্ভাব্য যেসব ঝুঁকির কথা বলছেন, সেগুলো হলো—
প্রদাহ (ইনফ্ল্যামেশন)
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস
অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্যে পরিবর্তন
তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

টুথপেস্ট কেনার সময় কী দেখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং সচেতন হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। টুথপেস্ট কেনার আগে এর মোড়কে উল্লেখ থাকা উপাদানের তালিকা ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।
ফ্লুরাইড: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ পিপিএম ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট উপযোগী।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বা সিন্থেটিক পলিমার: অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কণা বা প্লাস্টিক বিড রয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত।
অ্যাব্রেসিভ: হাইড্রেটেড সিলিকা বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের মতো নিরাপদ অ্যাব্রেসিভ উপাদান থাকলে তা ভালো।
সোডিয়াম লরিল সালফেট (এসএলএস): যাদের মুখে বারবার ঘা বা জ্বালাপোড়া হয়, তারা এসএলএস-মুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারেন।

লক্ষণীয় বিষয়
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ব্রাশ বা ফ্লস করার সময় অতিরিক্ত জোরে ঘষাঘষি করা উচিত নয়। এতে মাড়ির ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ব্রাশের ব্রিসল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। নরম ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করা এবং তিন থেকে চার মাস পরপর ব্রাশ পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্রিসল ছড়িয়ে গেলে বা বেঁকে গেলে আরও আগেই ব্রাশ বদলে ফেলা উচিত। এ ছাড়া ব্রাশ ও টুথপেস্ট সরাসরি রোদ বা অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে রাখা উচিত নয়। অতিবেগুনি রশ্মি ও উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাস্টিক দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। ব্রাশ পরিষ্কারের জন্য কুসুম গরম বা ঠান্ডা পানি ব্যবহার করাই যথেষ্ট। খুব গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো।

ব্রাশ বা ফ্লস করার পর ভালোভাবে থুতু ফেলে মুখ পরিষ্কার করতে হবে। যদিও দাঁতের চিকিৎসকেরা সাধারণত বেশি পানি দিয়ে কুলি করতে নিরুৎসাহিত করেন, যাতে ফ্লুরাইড দাঁতের ওপর কার্যকর থাকে। তবে অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করলে মুখে থাকা অবশিষ্ট কণা বের হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে বাজারে বাঁশের হাতলযুক্ত ব্রাশ ও সিল্ক ফ্লসের মতো বিকল্পও পাওয়া যায়। এগুলো প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এগুলো সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বা সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী—এমন প্রমাণ এখনো মেলেনি। এ ছাড়া এসব পণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি।

ইএসডিওর মতে, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে কোনো জাতীয় মানদণ্ড, বাধ্যতামূলক পরীক্ষাপদ্ধতি বা লেবেলিং নীতি নেই। তাই পণ্যের উপাদান স্পষ্টভাবে উল্লেখ, নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় মানদণ্ড হালনাগাদের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, টুথপেস্টের জাতীয় মানে মাইক্রোপ্লাস্টিক-সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

মাইক্রোপ্লাস্টিক আতঙ্ক, টুথপেস্ট ব্যবহারে করণীয় | স্বাস্থ্য কথা