মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়িয়ে ১০০ ডলার করার দাবি এনডিএফের

ছবি: সংগৃহীত
ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়ে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে পিছিয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। সংগঠনটির মতে, কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দের অভাবে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ ন্যূনতম ১০০ ডলারে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে এনডিএফ। একই সঙ্গে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে হলে এ পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি জানানো হয়। বৈঠকে স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান সংকট, বাজেট কাঠামো, স্বাস্থ্য অর্থায়ন, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ, বৈষম্য এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংসদ সদস্য, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সাংবাদিকরা আলোচনা করেন।
এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও গবেষক ডা. মো. মিজানুর রহমান।
তার উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী ন্যূনতম ৫ শতাংশ প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. এম এ সবুর, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. দিদারে আলম মহসিনসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ৫০ থেকে ৬০ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। মালদ্বীপে স্বাস্থ্যখাতে ১০০০-১২০০ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকায় মাথাপিছু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ডলার। কম বরাদ্দের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসছে না।
তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে ‘ল রিসোর্স হাই ডিমান্ড’ সংকটের মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, জেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আইসিইউ ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব, দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ জনগণের চিকিৎসা প্রাপ্তিকে সীমিত করে তুলেছে।
থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন থাকলে বাংলাদেশও একটি টেকসই ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। জেলা পর্যায়ে আইসিইউ, এনআইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ক্যানসার ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র সম্প্রসারণ করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বাড়ানো এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) ও টেলিমেডিসিন সম্প্রসারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংসদ সদস্য সাবেকুন নাহার বলেন, ‘বৈষম্যমূলক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। যেসব খাত অবহেলিত অবস্থায় আছে, সেসব খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত একটি খাতের মধ্যে একটি হলো স্বাস্থ্যখাত। ব্যাপকহারে লুটপাট হয়েছে এইখাতে। সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবে স্বাস্থ্যখাত অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।’
ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সাদরুল আলম বলেন, ‘স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। এতে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিতে সহজ হবে এবং সহজে চিকিৎসা নিতে পারবে। সেইসঙ্গে এআইভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাখাত গড়ে তুলতে হবে।’
যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেউদ্দীন ফরিদ বলেন, ‘প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের ৭ হাজার কোটি টাকা ফেরত চলে যায়। বাজেটের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা খুবই নাজুক। ইংল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তাদের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট আমাদের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি। আমাদের জনগণ ২০ কোটি আর তাদের দেশে মানুষ ৬ কোটি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার চাইলে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়াতে পারে। সরকার বলছে, স্বাস্থ্যখাতের বাজেট ২০৩০ সালে জিডিপির ৫ শতাংশ করবে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য পদেও লোকবল সংকট রয়েছে। আবার কাগজে কলমে চিকিৎসক, নার্স আছে, কিন্তু বাস্তবে নাই। আমাদেরকে মূল সমস্যায় হাত দিতে হবে, সমাধানের দিকে যেতে হবে।’
এনডিএফের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘বাজেট যতটুকু হয়, এটার সঠিক ব্যবহার করতে হবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার মতোও লোকবল নেই এবং লোকবল যতটুকু আছে তাদেরকেও সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।’
এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর বেসিক সাবজেক্টে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আলাউন্স দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে দেয়া হচ্ছে না। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতেও দিতে হবে। এতে বেসিক সাবজেক্টের প্রতি অনেকেই আগ্রহী হবে। নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ হচ্ছে, বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর মান ঠিক নেই। সারাদেশের মেডিকেল কলেজগুলো পড়াশোনা মান ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’
বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- অধ্যাপক ডা মোস্তাফিজুর রহমান, এনডিএফ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. আতিয়ার রহমান, জয়েন্ট সেক্রেটারি ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব এবং অফিস সম্পাদক ডা. একেএম জিয়াউল হক, ন্যাশনাল নার্সেস ফোরাম সভাপতি ইউনুস আলীসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা।
ভোরের আকাশ/সু.পা



