বিশেষ

নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যালেরিয়ায় ফের সংক্রমণ ঝুঁকি

দেশে হামজনিত মৃত্যুর উদ্বেগের মধ্যেই দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যালেরিয়া আবার নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে। সম্প্রতি এক উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তার ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চলভিত্তিক জীবনযাপন, সীমান্তবর্তী চলাচল, পর্যটন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন মশার জরিপ না হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

গত ২১ মার্চ ঢাকার দুটি ট্যুর গ্রুপের ১৯ সদস্যের একটি দল বান্দরবান ভ্রমণে যায়। সেখান থেকে ফেরার পর কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবস্থার অবনতি হলে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হলে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ছাড়া চলতি মাসে রাজধানীর সূত্রাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে জ্বর নিয়ে কয়েকজন রোগী ভর্তি হন। পরে তাদের ম্যালেরিয়া শনাক্ত হলে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, কারণ ম্যালেরিয়ার ওষুধ সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এক কর্মকর্তা জানান, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ থাকায় ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। যদিও গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় কার্যক্রম চলছে, তবে তা পূর্ণমাত্রায় পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, গত দুই বছর কোনো জরিপ না হওয়ায় ম্যালেরিয়ার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকার স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী চার মাস অন্তর জরিপ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ডেথ রিভিউ বা অটোপসিও করা হয়নি। ফলে কোন ধরনের পরজীবী—প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স নাকি প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম—দায়ী, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ঢাকায় অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেলেও সেগুলো জীবাণুবাহী কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, গত বছর দেশের ১৩টি জেলায় ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং মৃত্যু হয় ১৬ জনের। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে একজনের। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বান্দরবান, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ জন—মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজারে ৮৪৫ জন এবং খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

এ পরিস্থিতি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সচিব ম্যালেরিয়ায় মারা যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১৭ হাজার ২২৫ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেও করোনা মহামারির সময়ে এ সংখ্যা কমে যায়। তবে ২০২২ সাল থেকে আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। গত বছর আক্রান্ত হন ১৩ হাজার ১০০ জন এবং ৯ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরে অক্টোবর পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৯১ জন আক্রান্ত এবং ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এখনো ম্যালেরিয়ার প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে স্থানীয় সংক্রমণ বিদ্যমান। বিশেষ করে বান্দরবানের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। পর্যটকদের মাধ্যমে এসব এলাকা থেকে সংক্রমণ শহরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ম্যালেরিয়া এখন আর শুধু গ্রাম বা পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; ভ্রমণ ও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে এটি শহরেও ছড়াতে পারে। ঢাকায় ফেরত আসা কয়েকজন রোগীর মধ্যে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত এক দশকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং কমিউনিটি পর্যায়ের চিকিৎসা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সীমান্তবর্তী চলাচল, পর্যটন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণে সতর্কতা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় আবার সংক্রমণ বাড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস (২৫ এপ্রিল) সামনে রেখে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

ভোরের আকাশ/সু.পা

নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যালেরিয়ায় ফের সংক্রমণ ঝুঁকি | স্বাস্থ্য কথা | ভোরের আকাশ