স্বাস্থ্য সেবা

ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে শুল্কছাড়, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বড় উদ্যোগ

ছবি: সংগৃহীত

সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং দেশীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বড় ধরনের শুল্ক ও করছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ব্যয় কমানো, দেশে আন্তর্জাতিক মানের ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদন উৎসাহিত করা এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডায়ালাইসিসে কমবে ব্যয়
প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার। বর্তমানে এ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) রয়েছে। নতুন বাজেটে এই দুই ধরনের কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর ফলে কিডনি রোগীদের প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে নতুন সুবিধা
দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এবং স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহিত করতে ক্যানসারবিরোধী ওষুধ তৈরির কাঁচামালের তালিকায় নতুন করে আরও ৯টি উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

এর ফলে দেশে উৎপাদিত ক্যানসারের ওষুধের দাম কমবে এবং আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদনে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওষুধ শিল্পে এপিআই উৎপাদনে প্রণোদনা
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন বাড়াতে নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে রেয়াতি সুবিধার আওতায় এনে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এর ফলে দেশীয় ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা
দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিছু কাঁচামালে ১৫ শতাংশ এবং অন্য কিছু কাঁচামালে ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় এ সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। মানবিক বিবেচনায় মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মর্চুয়ারি আমদানির শুল্কও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

‘চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে’
যদিও বাজেটের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, তবে তারা মনে করছেন স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু চিকিৎসা ব্যয় কমানোই যথেষ্ট নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুস্তাক হোসেন বলেন, করছাড়ের ফলে রোগীরা কিছুটা সুবিধা পেলেও মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধে। তার মতে, ক্যানসার ও কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ার পেছনে জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে দুর্বলতা বড় কারণ।

তিনি বলেন, ডায়ালাইসিসে ৮০০ টাকা খরচ কমলেও অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী শহরে যেতে হয়। যাতায়াত ব্যয়, ওষুধ কেনা এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের ওপর আর্থিক চাপ থেকেই যায়।

তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি বা ক্যানসারের মতো রোগ যাতে জটিল পর্যায়ে না পৌঁছায়, সেজন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

তাদের ভাষ্য, গ্রামীণ পর্যায়ে সহজে রক্ত পরীক্ষা, কিডনি কার্যকারিতা নির্ণয় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগ আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বড় অঙ্কের করছাড়ের সুফল মূলত শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিকিৎসা ব্যয় কমানোর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

ভোরের আকাশ/সু.পা