রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু তৈরি, বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

ছবি: সংগৃহীত
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় এবার ল্যাবরেটরিতে মানুষের রক্তের কোষ থেকে প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরিতে সাফল্যের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ‘কনসেপশন’ স্টেম সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ পদ্ধতির নাম ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস (IVG)।
গবেষকদের মতে, প্রথমে মানুষের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে সেটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলে রূপান্তর করা হয়। এই ধরনের স্টেম সেল থেকে শরীরের প্রায় সব ধরনের কোষ তৈরি করা সম্ভব। এরপর বিভিন্ন রাসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব স্টেম সেলকে প্রাইমোরডিয়াল জার্ম সেলে পরিণত করা হয়, যা থেকে পরবর্তীতে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরি হতে পারে। এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সফলভাবে রক্তের কোষ থেকে প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরি করেছেন।
গবেষণাটি ভবিষ্যতে পুরোপুরি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। বিশেষ করে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) চিকিৎসা আরও সহজ ও কম কষ্টদায়ক হয়ে উঠবে। বর্তমানে আইভিএফের জন্য নারীদের শরীর থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে দীর্ঘদিন হরমোন ইনজেকশন নিতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হয়। রক্তের কোষ থেকেই যদি ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে এসব জটিল ও কষ্টকর প্রক্রিয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।
এ প্রযুক্তি বেশি বয়সে মাতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সাধারণত ৩০ বছরের পর নারীদের ডিম্বাণুর গুণগত মান ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ৪০ বছরের পর গর্ভধারণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গবেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে মায়ের নিজের রক্ত থেকেই নতুন ও সুস্থ ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হলে নিরাপদ মাতৃত্বের সুযোগ আরও বাড়বে।
এছাড়া ক্যানসার চিকিৎসার কারণে যেসব নারীর প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের জন্যও এ প্রযুক্তি আশার বার্তা হতে পারে। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির ফলে অনেক নারীর ডিম্বাশয় স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে রক্তের কোষ ব্যবহার করে ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হলে তারাও জৈবিকভাবে মাতৃত্বের সুযোগ পেতে পারেন।
গবেষকদের মতে, ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমজনিত ত্রুটির কারণে অনেক ক্ষেত্রে বারবার গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। সুস্থ ও কার্যকর ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিও কমানো যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণা এখনও উন্নয়নধীন পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি এখনো নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পাশাপাশি এই প্রযুক্তি সন্তান জন্মদানে নারী বা পুরুষের ভূমিকার বিকল্প নয়। বরং ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসাকে আরও কার্যকর, নিরাপদ ও সহজ করার লক্ষ্যেই এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



