স্বাস্থ্য সেবা

স্বাস্থ্যখাতে নতুন মাত্রা: বিএমইউতে রোবটিক থেরাপির সাফল্য

ছবি: সংগৃহীত

দুর্ঘটনা, স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতে কর্মক্ষমতা হারানো রোগীদের পুনর্বাসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এআই চালিত রোবটিক ফিজিওথেরাপি। আধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন অনেক রোগী। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চীন সরকারের দেওয়া ৫৭টি অত্যাধুনিক মেশিনের মাধ্যমে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে এই সেবা।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে কোমর ব্যথায় ভুগছিলেন বেসরকারি একটি বাইং হাউজের কর্মী মোহাম্মদ শুভ। ছয় মাস আগে নানা জটিলতার কারণে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয় তাকে। এরপর পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন হাঁটার সক্ষমতা। পরে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের রোবটিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারে কয়েক মাসের চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হাঁটার শক্তি ফিরে পাচ্ছেন তিনি।

মোহাম্মদ শুভ বলেন, “ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও আমি অনেক ভালো আছি। অস্ত্রোপচার না করলে হয়তো আমার শরীরের নিচের অংশ পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারত। সেখান থেকে এখন অনেকটাই ফিরে এসেছি।”

একই সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৪২ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। তিন বছর আগে স্ট্রোকের পর মস্তিষ্কে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয় তার। এরপর শরীরের ডান পাশের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি।

ভারত ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না পাওয়ার পর তিনি আসেন বিএমইউর এই রোবটিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারে। এআই নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের সহায়তায় নতুন করে হাঁটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন বলেন, “স্ট্রোকের পর আমরা অনেক সময় হাঁটার স্বাভাবিক পদ্ধতি ভুলে যাই। এই যন্ত্রের মাধ্যমে বারবার অনুশীলনের ফলে আমার মস্তিষ্ক আবার নতুন করে শিখছে কীভাবে হাঁটতে হবে।” প্রতিদিন এই সেন্টারে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী বিভিন্ন ধরনের থেরাপি নিচ্ছেন। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হচ্ছে চিকিৎসার ধরন ও সময়।

২০২৫ সালের আগস্টে চীন সরকারের সহায়তায় বিএমইউতে আসে ৫৭টি অত্যাধুনিক রোবট। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে চলতি বছরের মার্চ থেকে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়।

বিএমইউর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. নাদিম কামাল বলেন, “মেশিনের মাধ্যমে রোগীর কোন অঙ্গে কতটা দুর্বলতা রয়েছে তা নির্ণয় করা যায়। পরে সেই অনুযায়ী থেরাপির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে আমরা বায়োফিডব্যাক বলি। এর মাধ্যমে রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং স্নায়ু ও পেশির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে ফিরে আসে।”

এই সেন্টারে স্ট্রোক, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা, পক্ষাঘাত, স্নায়ুবিক অক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, নার্ভ ইনজুরি, দুর্ঘটনাজনিত জটিলতা এবং বিভিন্ন অঙ্গের দুর্বলতায় আক্রান্ত রোগীরা পুনর্বাসন সেবা পাচ্ছেন।

বিএমইউর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ বলেন, “স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি বা বিভিন্ন ধরনের পেশির দুর্বলতায় আক্রান্ত রোগীদের শূন্য থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একাধিক সেশনের মাধ্যমে রোগীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোবটিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীর পেশির দুর্বলতা নির্ণয় করে নির্দিষ্ট মাত্রায় থেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়া অঙ্গ ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং রোগীরা ফিরে পাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনের আশা।

ভোরের আকাশ/সু.পা

স্বাস্থ্যখাতে নতুন মাত্রা: বিএমইউতে রোবটিক থেরাপির সাফল্য | স্বাস্থ্য কথা