বিশেষ

স্বাস্থ্যসেবায় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের

ছবি: সংগৃহীত

শুধু বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন সম্ভব নয়, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্ধ ও কার্যকরভাবে তার বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো সুশাসনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য নীতির ঘাটতিতে ভুগছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় করতে না পারাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মঙ্গলবার (১৯ মে) অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট: একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনে নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ আয়োজন যৌথভাবে করে বণিক বার্তা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। এছাড়া বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম হুমায়ুন কবির সরকার, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধিরা।

১. জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো মূলত চিকিৎসাকেন্দ্রিক। অথচ জনস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। অসুস্থ হওয়ার আগেই মানুষকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ২৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রয়েছে। পাশাপাশি সর্বজনীন হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

২. বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অনেক সময় বরাদ্দ পাওয়া গেলেও তা কার্যকরভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয় না।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার স্বাস্থ্য খাতে খারাপ বাজেট দেয়নি। তবে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই ব্যয় করা যায় না। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৩. স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি ও সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

তিনি আরও বলেন, পরিচালন ব্যয় বাড়লেও অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশই ব্যয় করা সম্ভব হয় না। তাই বাজেট বাড়ানোর আগে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

৪. সমন্বিত জনস্বাস্থ্য নীতির দাবি
অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও কৃষির মতো খাতও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এজন্য তিনি ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’-ভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ভবিষ্যতে দারিদ্র্য বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বাড়বে। তাই বাজেট বৃদ্ধি ও বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, দেশে নানা স্বাস্থ্যনীতি থাকলেও এখনো সমন্বিত জনস্বাস্থ্য নীতি গড়ে ওঠেনি। তিনি দ্রুত একটি আধুনিক জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান।

৫. স্বাস্থ্যকর্মী সংকট ও বেসরকারি খাতের দাবি
গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ডা. নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মী না বাড়ায় ইমিউনাইজেশন কাভারেজ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে।

বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়, স্বল্পসুদে ঋণ, স্বাস্থ্য বীমা চালু এবং বেসরকারি হাসপাতালের জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের দাবি জানান। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ বাণিজ্যিক খাতের মতো কর কাঠামোর আওতায় রাখলে সেবার ব্যয় বেড়ে যায়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত রোগীদের ওপর পড়ে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

স্বাস্থ্যসেবায় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের | স্বাস্থ্য কথা