স্বাস্থ্যসেবায় সমতা আনতে বাড়াতে হবে সরকারি বিনিয়োগ : ওয়াহিদউদ্দিন

ছবি: সংগৃহীত
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্যও তত বাড়বে। বিপরীতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো গেলে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি উপকৃত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণ চাহিদা শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নয়, সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেক সময় মানুষ অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেয় না, আবার পরিবারে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব ও সামাজিক রক্ষণশীলতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
তিনি জানান, বিআইডিএসের আগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেটে স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলক উন্নত হলেও মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার কম ছিল। অন্যদিকে ফরিদপুরে সুযোগ-সুবিধা কম থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু অবকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে এখনও দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যয়ের হার যত বাড়বে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও তত প্রকট হবে। কারণ আয়ের বৈষম্যের তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয়ের বৈষম্য আরও বেশি। তাই সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন।
গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবায় এখনও বৈষম্য রয়ে গেছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে সরকারি ব্যয় বাড়ানো বৈষম্য কমাতে সহায়ক।
তিনি স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় প্রায় সমান হলেও সরকারি ব্যয়ের অনুপাত বেশি হওয়ায় ভিয়েতনাম স্বাস্থ্য সূচকে এগিয়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে নীতিনির্ধারণে সীমিত সম্পদের কারণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, একদিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে বিপুল মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে ডায়ালাইসিস বা আইসিইউর মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসাও প্রয়োজনীয়। তবে সীমিত সম্পদের কারণে সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতেই হয়।
মধ্যবয়সীদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ, খাদ্য দূষণ ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও কিডনি রোগ বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
সেমিনারে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ব্যয় এবং অর্থ সংকটের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার বিষয় নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
ভোরের আকাশ/সু.পা



