ইরান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ঝুঁকি নিলে এক দিনেই মিলিয়নিয়ার

এআই খাতের জোয়ারের বাইরে—ইরান যুদ্ধের ফলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নতুন এক খাত তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব অর্থনীতি নতুন একদল মিলিয়নিয়ারের তৈরি করছে—যারা ২৪ ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে ১০ লাখ মার্কিন ডলার আয় করছেন। ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাব 'অ্যানথ্রোপিক'-এর কথাই ধরা যাক; একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, কেবল একক গ্রাহকের 'ক্লড' এআই ব্যবহারের ওপর ভর করে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি, যা দিনে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সমান।
তবে এআই খাতের এই জোয়ারের বাইরে—ইরান যুদ্ধের ফলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নতুন এক খাত তৈরি হয়েছে। সেটি হলো—ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনক হরমুজ প্রণালি পারি দিতে প্রস্তুত থাকা তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ মালিকরা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ শিল্পের সদস্য প্রতিষ্ঠান– 'বাল্টিক এক্সচেঞ্জ'-এর চলতি সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পাড়ি দিয়ে—চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে একটি জাহাজের দৈনিক ভাড়া পৌঁছেছে ১০ লাখ ৩৫ হাজার (১.০৩৫ মিলিয়ন) ডলারে। এতে করে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজের দৈনিক পরিবহনের ভাড়া সাত অঙ্কের ঘর স্পর্শ করেছে। এর বিপরীতে, স্বাভাবিক সময়ে বা ইরান যুদ্ধের আগে—পারস্য উপসাগর থেকে ছেড়ে যাওয়া একই ধরনের বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের (ভিএলসিসি) দৈনিক ভাড়া ছিল প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ডলার (প্লাটস ভিএলসিসি সূচক অনুযায়ী)।
ইতোমধ্যে সাত মাসে গড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। আর এই সময়ে এসে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই অবস্থায়, পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির প্রয়োজনীয়তাও তীব্র হয়ে উঠেছে। কারণ ব্যাপক সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি-বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান 'ভার্টেক্সা'র প্রধান ফ্রেইট এনালিস্ট ইওনিস পাপাদিমিত্রিও জানান, এই অনিয়ন্ত্রিত জাহাজ ভাড়ার মূল কারণ হলো তাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবাহিত তেলের আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধিও এখানে ভূমিকা রাখছে।
তবে তিনি বলেন, "পুরো বিষয়টাই ঝুঁকির ওপর নির্ভর করছে।"
পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার কারণ কী?
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ক্রমাগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবারও হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলের ট্যাংকার ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাপাদিমিত্রিও বলেন, "আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং জাহাজে আক্রমণের কারণে—ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং নৌযানের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে গেছে। এটিই ট্যাংকার জাহাজের ভাড়া বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।"
হরমুজ প্রণালির পূর্ব দিক দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেশি থাকায়—তুলনামূলক কম জাহাজ ওই দিক ঘেঁষে যেতে চাইছে। এর ওপর ভিত্তি করে জাহাজের বীমা প্রিমিয়ামও আকাশচুম্বী হয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে বীমা প্রিমিয়াম ছিল জাহাজে পরিবহন করা কার্গোমূল্যের ০.৫ থেকে ১ শতাংশ, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ শতাংশে। শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত বীমা খরচ পরিশোধ করতে হচ্ছে ট্যাংকার ভাড়াকারী বা পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেই।
এই বাড়তি চাহিদা ট্যাংকার বাজারের কিছু বড় কোম্পানিকে আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছে। এতে করে, সামুদ্রিক পরিবহন বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা কমে গিয়ে—নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বাণিজ্যিক গ্রুপগুলোও তাদের নিজস্ব ট্যাংকার জাহাজের বহর বাড়াচ্ছে এবং নতুন জাহাজ কিনছে, যাতে তারা নিজস্ব পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাপ্লাই চেইনে আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।
কারা লাভবান, কারাই বা ক্ষতিগ্রস্ত?
জাহাজ ভাড়ার এই চড়া মাশুল পরিশোধ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়ছে তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলো। তাদের একদিকে যেমন জাহাজের উচ্চ ভাড়া গুণতে হচ্ছে , অন্যদিকে কিনতে হচ্ছে চড়া দামের অপরিশোধিত তেল। আবার হরমুজ প্রণালি এড়াতে বিকল্প নৌপথে বাড়তি সময়ও লাগছে চালান আনতে।
এর ফলে শোধনাগারগুলোর লাভের মার্জিন মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
তবে জ্বালানি পণ্য পরিবহনের এই রেকর্ড মাশুল—শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য চড়া মুনাফার সুযোগ বয়ে এনেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে পুরো নৌপরিবহন শিল্প এখন সবচেয়ে বড় লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম শিপব্রোকার প্রতিষ্ঠান 'ক্লার্কসন্স' ইতোমধ্যেই তাদের রেকর্ড আয়ের কথা জানিয়েছে। গত প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে, যার মধ্যে পরিচালন মুনাফা বার্ষিক ভিত্তিতে ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি কেস এই বড় আয়ের পেছনে— ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাহিদার কথা উল্লেখ করেছেন।
শিকাগোভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টারের তথ্য অনুযায়ী, অয়েল ফ্রেইট ফান্ড 'ব্রেকওয়েভ ট্যাংকার শিপিং ইটিএফ'-এর শেয়ারদর চলতি বছর এপর্যন্ত ৩,৬০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। শিপিং খাতের মুনাফায় বিনিয়োগকারীরা যে কতটা আস্থা রাখছেন, এটি তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ।
পাপাদিমিত্রিও বলেন, "যখনই কোনো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হয়, ঠিক তখনই শিপিংখাতের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পান। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি।"
ভোরের আকাশ/এনএস