যুক্তরাষ্ট্রে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত ৫ হাজারের বেশি

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং এখন পর্যন্ত মোট ৫,১৮২ জন আক্রান্তের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের পর এক বছরে দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ১৮ শতাংশ। আর পাঁচ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৪১ শতাংশ। সব মিলিয়ে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা মোট আক্রান্তের প্রায় ৫৯ শতাংশ।
আক্রান্তদের মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৩ জনের সংক্রমণ বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়ার মধ্যেই হামের এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের মধ্যে টিকা নেওয়ার হার ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৪ শতাংশে।
২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া হামের সংক্রমণ গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৫ সালে দেশটিতে ২ হাজার ২৮৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে হাম আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সংস্থাটির দেওয়া মৃত্যুর সংখ্যা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তাদের প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে কম। বিশেষ করে প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেনসিলভানিয়ায় এ নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর রাজ্যটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৭ জন।
হামে মৃত্যুর হিসাব কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
পেনসিলভানিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির শরীরে হাম নিশ্চিত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তার মৃত্যু হলে সেটিকে ‘হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে মৃত্যুর কারণ অন্য কোনো সম্পর্কহীন ঘটনা হলে তা এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়।
গত আগস্টে পেনসিলভানিয়া জানায়, টিকা না নেওয়া দুজনের মৃত্যু হয়েছে হামে আক্রান্ত হয়ে। সিডিসি প্রথমে এই দুটি মৃত্যুর ঘটনা জাতীয় হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী কেনেডি মৃত্যুর জন্য হাম দায়ী ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সংস্থাটি ওই দুটি ঘটনা হিসাব থেকে বাদ দেয়।
সিডিসি জানিয়েছে, হামে মৃত্যুর হিসাবের জন্য একটি অভিন্ন সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর মহামারিবিদদের সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে।
তবে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে এই বিরোধ হামের প্রভাব পর্যবেক্ষণে সিডিসির দীর্ঘদিনের পদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মহামারিবিদেরা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর হিসাব রাখা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সিডিসির দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতি।
দুই দশকেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে দেশটিতে আবারও সংক্রমণ বাড়ছে। বিশ্বজুড়েও হামের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মানুষ টিকা নিয়ে সন্দিহান অথবা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে, সেসব জায়গায় সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কোনো একটি ভৌগোলিক এলাকায় টিকা নেওয়ার হার কমে গেলে হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষও হামের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই হাম প্রতিরোধকে তারা বিশ্বজুড়ে সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।
ভোরের আকাশ/আ.র