সোনম ওয়াংচুকের স্কুলের ক্লাস বন্ধের নোটিশ

ভারতের লাদাখের বিখ্যাত প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক পরিচালিত একটি স্কুলের ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে লাদাখ প্রশাসন। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই ওয়াংচুক পরিচালিত লেহ-র ডেসার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলে ক্লাস চালুর অভিযোগে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ডেসার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলের মূল প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অল্টারনেটিভস, লাদাখ (হিয়াল) বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি বরাদ্দ বাতিলের বিরুদ্ধে যখন ওয়াংচুক আদালতে লড়াই করছেন, তখন প্রতিষ্ঠানটি নতুন ঝামেলায় পড়ল। লেহ-র তহশিলদার কর্তৃক জারি করা এই নোটিশটি ওয়াংচুকের স্ত্রী এবং হিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডক্টর গীতাঞ্জলি জে আংমো-র উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে।
নথিতে উক্ত কর্মকর্তা তাঁকে ‘কঠোরভাবে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার’ এবং জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলাটিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনো কাজ না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রশাসন জানিয়েছে, হিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোসিস্টেমের অধীনে ফিয়াং-এ ডেসার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের জন্য নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট চেয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর লেহ-র ডেপুটি কমিশনারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন আংমো। তবে প্রশাসনের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সম্মতি বা অনুমোদন ছাড়াই স্কুলে ইতিমধ্যেই ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, আদালত এই মামলার নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত বা পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আংমোকে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা বা শুরুর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন এই সতর্কবার্তাকে হিয়াল-কে বরাদ্দ করা জমি নিয়ে চলমান আইনি বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তাদের কোনো পদক্ষেপ আদালতের বিচারাধীন বিষয়টিকে প্রভাবিত না করে। এই মামলার সূত্রপাত ২০১৮ সালের মে মাসে, যখন হিমালয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে একটি বিকল্প বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ফিয়াং থাং-এ হিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল।
শর্ত সাপেক্ষে ৪০ বছরের ইজারার জন্য এই বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট লাদাখ প্রশাসন এটি বাতিল করে দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি ইজারার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেনি এবং যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল তাও প্রতিষ্ঠা করেনি। হিয়াল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আদালত পিটিশনের শুনানির সময় প্রশাসনকে বিতর্কিত জমির ওপর তৃতীয় পক্ষের কোনো অধিকার তৈরি করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। তবে এই অন্তর্বর্তী আদেশে জমি বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়নি। অক্টোবরে প্রশাসন ১৩৬ পৃষ্ঠার এক হলফনামায় বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
তাদের দাবি, হিয়াল-এর বরাদ্দটি ২০১৯ সালের মে মাসেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। কারণ এক বছরের মধ্যে ইজারা দলিল কার্যকর করা হয়নি এবং বাধ্যতামূলক ল্যান্ড প্রিমিয়াম জমা দেওয়া হয়নি। প্রশাসন লাদাখের উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২০২৬ সালের অক্টোবরের একটি সার্টিফিকেটের কথাও উল্লেখ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে হিয়াল কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় নয় এবং এর কোর্সগুলোর কোনো বিধিবদ্ধ অনুমোদন নেই।
তবে প্রতিষ্ঠানটি এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে। আংমো জানিয়েছেন, জমি বরাদ্দের মাত্র ১৫ দিন পর, ২০১৮ সালের ২০ মে হিয়াল ইজারা দলিল কার্যকরের জন্য আবেদন করেছিল এবং বারবার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছিল। ওয়াংচুকও প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রক্রিয়াটিতে বিলম্ব করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেন, ইজারা দলিল কার্যকর করার জন্য তিনি ৫টি লিখিত আবেদন, ১৫ বার সশরীরে সাক্ষাৎ এবং ৩০ বার ফোন করেছিলেন।
তিনি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির একটি সরকারি চিঠির কথা উল্লেখ করেন, যা তাঁর মতে—লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর এবং কোভিড মহামারির কারণে হওয়া বিলম্বের কথা স্বীকার করেছিল এবং ইজারার আনুষ্ঠানিকতা বাকি থাকাকালীন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। ওয়াংচুকের অভিযোগ, লাদাখে তাঁর সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলনের কারণে তাঁকে টার্গেট করতেই এই জমি বিরোধকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড় থেকে জানিয়েছে যে বরাদ্দের শর্তাবলি পূরণ করা হয়নি।
সমাজসেবা এবং উদ্ভাবনী শিক্ষার জন্য ২০১৮ সালে ওয়াংচুক এশিয়ার নোবেলখ্যাত মর্যাদাপূর্ণ র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি লাদাখের পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষার দাবিতে অনশনসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও পদযাত্রা করে আসছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন একাত্মতা প্রকাশ করে দিল্লির যন্তর মন্তরে আমরণ অনশনে করেছিলেন ওয়াংচুক। বলিউডের ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় আমির খান অভিনীত জনপ্রিয় চরিত্র ‘ফুংসুখ ওয়াংড়ু’ মূলত ওয়াংচুকের জীবন ও কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এম