হরমুজ বন্ধের মাঝেও এশিয়া যেভাবে জ্বালানি সংকট সামাল দিচ্ছে

হরমুজ প্রণালী বন্ধের কারণে সৃষ্ট অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলো মূলত বিকল্প সরবরাহ রুট ব্যবহার, আমদানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
চাহিদার বিপরীতে বড় ধরনের সংকট তৈরির পর এশিয়ার বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য উৎপাদকরা। বিপরীতে অন্যতম বড় আমদানিকারক চীন তেল কেনা কমিয়েছে। এই ভারসাম্যের ফলে এশিয়ার দেশগুলো প্রয়োজনীয় তেলের মোটামুটি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেরেছে।
কার্গো ট্র্যাকিংয়ের প্রতিষ্ঠান কেপলারের এলএনজি-বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক গো কাটায়ামা বলেন, শুরুতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ মোটামুটি বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পেরেছে।
এই সংকটের মাধ্যমে একটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে। সেটি হলো- ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের দেশগুলো হয়তো পারস্য উপসাগর থেকে আসা জ্বালানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেবে। আরেকটি বিষয় হলো- বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠা।
বাজারে যেভাবে ভারসাম্য আসে
হরমুজে অচলাবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে আসা বন্ধ হয়ে যায়। প্রণালি এড়ানোর পাইপলাইন থাকায় এশিয়ার ক্রেতারা আংশিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের দিকে ঝোঁকে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা এসব বিকল্প পথের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাছাড়া, মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় কিছু তেলবাহী জাহাজও হরমুজ দিয়ে চলাচল করে।
এশিয়ার বাজারে চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। স্বল্প সরবরাহের বিপরীতে তারা তেল কেনা কমিয়ে সংকট কিছুটা সামাল দিতে সহায়তা করে। গত বছরের জুলাই-আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে তারা এক-তৃতীয়াংশ কম তেল আমদানি করেছে। বিপরীতে রাশিয়া থেকে আমদানি বাড়িয়েছে।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রও রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। মিত্র দেশগুলোকে মস্কোর কাছে থেকে আমদানির জন্য অনুমতি দেয়। এতে ভারত নতুন করে আমদানির পরিমাণ বাড়ায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া আরও বেশি পরিমাণে তেল কেনা শুরু করে। ফলে এশিয়ার বাজারে মার্কিন তেল সরবরাহ দ্রুত গতিতে বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা ২৩ লাখে দাঁড়িয়েছে।
তবে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে বৈশ্বিক চাহিদা কমার বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছে। কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে বিশ্বে তেলের চাহিদা প্রায় ২ শতাংশ কমেছে।
এলএনজির বাজার যেমন ছিল
প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এশিয়া উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল। কিন্তু যতটুকু সরবরাহ হয়, ততটুকুর বিকল্প খুঁজে পাওয়া যে কঠিন, তা গত কয়েক মাসে প্রমাণ হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার থেকে সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমার কারণে দাম বেড়ে যায়। কিন্তু তারপরও এশিয়ার তুলনামূলকভাবে বড় অর্থনীতির দেশগুলো বিকল্প এলএনজি চালান সংগ্রহ করতে পেরেছে। ভারত, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অন্য সরবরাহকারীর কাছে থেকে বেশি গ্যাস কিনতে পেরেছে।
কেপলারের এলএনজি-বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক গো কাটায়ামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস রপ্তানি প্রায় প্রতিমাসেই রেকর্ড গড়েছে। এটি না হলে এশিয়ার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো।
তবে তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো উপসাগরীয় রপ্তানিকারকের বিকল্প খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিল্প প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এলএনজি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই অনেক দেশের কাছে মজুতও সীমিত ছিল।
ভবিষ্যতের ভারসাম্য অনিশ্চিত
এশিয়ার যেসব ক্রেতা স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের জন্য এলএনজি কিনছে, তাদের গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম গত এপ্রিলে সাময়িকভাবে ১৫০ ডলারে উঠলেও এখন ১০০ এর কাছাকাছি আছে। কিন্তু পারস্য উপসাগরে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
কেপলারের বিশ্লেষক গো কাটায়ামার মতে, শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার ক্রেতাদেরকে গ্যাসের জন্য ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এতে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
তেলের বাজারেও একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ চীন সম্প্রতি আবার আমদানি বাড়াতে শুরু করেছে। কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুইউ শু বলেন, ঘাটতি পূরণে কে এগিয়ে আসবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
মুইউ শু বলেন, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের অবকাশ না রেখে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। ফলে বাজারের ভারসাম্য ‘খুবই নাজুক’ অবস্থায় আছে।
ভোরের আকাশ/আ.র