‘মেশিনের স্বর্গ’ মানবতার জন্য হুমকি: পোপ লিও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করতে করতে এমন এক ‘মেশিনের স্বর্গ’ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ তার মানবিকতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন পোপ লিও চতুর্দশ।
শুক্রবার ফ্রান্স সফরের শুরুতে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ সতর্কতা জানান। এটি ফ্রান্সে কোনো পোপের প্রথম সরকারি সফর হিসেবে ১৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাটিকান সফর।
পোপ বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবন যখন মেশিন দ্বারা ক্রমাগত প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তখন মানবিকতা হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি এড়াতে মানুষের মধ্যে নৈতিক বিচারবোধ এবং কোনটি নৈতিকভাবে সঠিক তা বোঝার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থাকে যখন ‘বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে, তখন বিপরীতে মানুষের অবিচ্ছেদ্য মর্যাদা স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজ ব্যর্থ হচ্ছে। দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার মানদণ্ডে মানুষকে মূল্যায়ন করা হলে যারা আর উৎপাদনশীল নয়, তাদের প্রত্যাখ্যান ও পরিত্যাগ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
পোপ লিওর মতে, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়া উচিত; মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে নয়।
তিনি এআইকে তাঁর পোপত্বের শুরু থেকেই মানবতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এআই নিয়ে তাঁর প্রথম এনসাইক্লিক্যালেও প্রযুক্তির ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শুধু এআই নয়, জেনেটিক পরিবর্তন, সারোগেসি, মানব অঙ্গের বাণিজ্য এবং চিকিৎসার মাধ্যমে নিজের জীবন শেষ করার সুযোগের মতো বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তাহলে তা মানুষের জন্য নতুন ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ফ্রান্স যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পোপ লিও বলেন, এআই নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তা প্রযুক্তি খাতের অনেকের কাছেই পৌঁছেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভ্যাটিকান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
তাঁর মতে, এআই যেন মানুষকে সরিয়ে না দেয় বা শেষ পর্যন্ত মানবতার ক্ষতি না করে; বরং মানুষের জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
ফ্রান্স সফরের প্রথম দিনেই পোপ লিও পারমাণবিক অস্ত্র ও ‘পারমাণবিক প্রতিরোধ’ নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, পারমাণবিক প্রতিরোধের ধারণা ভুল, কারণ এটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, শান্তি শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং সংলাপ ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রতিদিন তা গড়ে তুলতে হয়। একই সঙ্গে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ভ্যাটিকানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
পোপ লিওর ফ্রান্স সফরে তাই এআই, মানবিক মর্যাদা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, পারমাণবিক অস্ত্র এবং শান্তি—এই কয়েকটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামনে এসেছে। তাঁর মূল বার্তা হলো, প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুতই হোক, তার কেন্দ্রে যেন মানুষ ও মানুষের মর্যাদাই থাকে।
ভোরের আকাশ/এম