সিন্ধু নদ চুক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে দিল্লি

সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক আলোচনা বা ভারতের অবস্থান নরম হয়েছে—এ ধরনের খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে ভারতের সরকারি সূত্র। একই সঙ্গে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো সরকারি বা অনানুষ্ঠানিক অনুমোদিত আলোচনা চলছে না এবং সিন্ধু নদ চুক্তি শিথিল করারও কোনো পরিকল্পনা নেই।
ভারতের উচ্চপর্যায়ের সরকারি সূত্রের মতে, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইসলামাবাদের প্রতি নয়াদিল্লির অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। আকাশপথ ব্যবহারসহ কিছু দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে যোগাযোগ থাকলেও পানি বণ্টন ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ভারতের অবস্থান আগের মতোই কঠোর থাকবে।
সরকারি সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি দুই দেশের সাবেক কর্মকর্তা, গবেষক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে যেসব আন্তর্জাতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোকে কোনোভাবেই সরকারি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। এসব বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা ব্যক্তিগত পরিচয়ে উপস্থিত থাকেন এবং সেখানে কোনো সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা দায়বদ্ধতা থাকে না।
ভারতীয় কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেন, প্রকৃত অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা বলতে বোঝায় এমন প্রক্রিয়া, যেখানে দুই দেশের সরকার অনুমোদিত প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপে অংশ নেন। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি সংস্থার আয়োজিত সভাকে সেই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায় না।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব আলোচনার সঙ্গে কোনো দেশের দূতাবাসেরও আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকে না। ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ের মতবিনিময়কে দুই দেশের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।
ভারতের কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে গত বছরের কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত প্রাণঘাতী হামলা। ওই ঘটনার পর ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ঐতিহাসিক সিন্ধু নদ চুক্তি কার্যত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় নয়াদিল্লি। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, পাকিস্তান তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি পুনরায় কার্যকর করার প্রশ্নই ওঠে না।
সরকারি সূত্রের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির সঙ্গে পানি বণ্টন ইস্যু ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। তাই পাকিস্তানের প্রতি নীতিগত অবস্থানে কোনো নমনীয়তার সুযোগ নেই বলে মনে করছে ভারত।
এদিকে চুক্তি স্থগিতের পর পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রকল্পে জোর দিয়েছে ভারত। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নদীর তলদেশে জমে থাকা পলি অপসারণের কাজও জোরদার করা হয়েছে, যাতে অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশটির পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে পাকিস্তান শুরু থেকেই ভারতের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে। ইসলামাবাদের দাবি, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের পরিপন্থী।
তবে ভারত বলছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তাদের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ ন্যায্য। সরকারি সূত্রের মতে, সন্ত্রাসবাদে দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো সম্ভাবনাই নেই। একই সঙ্গে সিন্ধু নদ চুক্তি নিয়ে নতুন কোনো ছাড় বা সমঝোতারও সুযোগ আপাতত নেই।
ভোরের আকাশ/সু.পা