ইরানের গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ জানজানির ইন্তেকাল

শিয়া মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রদ্ধেয় মারজা এবং কোম মাদ্রাসার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুসা শোবেইরি জানজানি ৯৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আহলে বাইতের ফকিহ এবং বিশ্ব শিয়া সম্প্রদায়ের মহান কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শোবেইরি জানজানির পবিত্র আত্মা আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে।
ঘোষণাপত্রে উদ্ধৃত করা হয় সেই কোরআনি আয়াত- ‘যাদের ফেরেশতারা সৎ অবস্থায় মৃত্যু দেন, তারা বলে, তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমরা যা করতে তার প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করো।
জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় ফুসফুসজনিত জটিলতা নিয়ে পবিত্র নগরী কোমের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এই প্রবীণ ধর্মগুরুকে। দুদিন নিবিড় পরিচর্যায় থাকার পর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানাজা ও দাফনের বিস্তারিত কর্মসূচি পরে জানানো হবে বলে তাঁর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
শোকবার্তায় ইসলামি মাদ্রাসাসমূহ, ইরানের সাধারণ জনগণ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অনুসারীদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনকে বর্ণনা করা হয়েছে গভীর চিন্তাশীলতা, নিরলস জ্ঞানচর্চা, খাঁটি ফিকহ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের আন্তরিক প্রয়াস, ইসলামি শিক্ষার প্রসার, শিয়া ইসলামের সুরক্ষা এবং মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে।
১৯২৮ সালের ২ মার্চ কোম শহরে জন্মগ্রহণ করেন শোবেইরি জানজানি, তাঁর পিতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমদ শোবেইরি জানজানি হযরত ফাতেমা মাসুমার (আ.) মাজারের পাশে বসতি স্থাপনের তিন মাস পরই। সেই পবিত্র নৈকট্যের স্মরণেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল মুসা। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রথিতযশা ফকিহ, কোম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল করিম হায়েরি ইয়াজদির ঘনিষ্ঠ সহচর, এবং ইমাম খোমেনির জ্ঞানচর্চা মহলের একজন সঙ্গী।
শৈশব থেকেই তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীতে কোম ও নাজাফের শীর্ষ পণ্ডিতদের কাছে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ হোসেন বরুজের্দি, সাইয়্যেদ মোহাম্মদ মোহাক্কেক দামাদ, সাইয়্যেদ আবুল কাসেম খোয়েই, সাইয়্যেদ মহসিন হাকিম, সাইয়্যেদ আবদুল হাদি শিরাজি এবং ইমাম খোমেনি নিজে।
হাদিস বর্ণনাকারীদের মূল্যায়নবিদ্যা তথা ইলমুর রিজালে তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রধান কর্তৃপক্ষ, এবং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কোমে উচ্চতর ফিকহ পাঠদান করেছেন। ১৯৯৪ সালে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলী আরাকির মৃত্যুর পর কোম মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি তাঁকে মারজা'ইয়াতের যোগ্য সাতজন ফকিহের একজন হিসেবে মনোনীত করে।
স্বভাবসুলভ সংযমের সাথে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন, জনসমক্ষে প্রদর্শনের চেয়ে শিক্ষাদান, গবেষণা ও পণ্ডিত তৈরির কাজেই বেশি নিবেদিত থাকতেন। দীর্ঘ বছর ধরে হযরত ফাতেমা মাসুমার পবিত্র মাজারে জামাতে নামাজও পরিচালনা করেছেন তিনি।
তাঁর এই প্রয়াণ কোম ও নাজাফের মাদ্রাসাসমূহ, আহলে বাইতের অনুসারী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এক বিরাট ক্ষতি- যে প্রজাতন্ত্র চিরকাল তার মহান ফকিহদের বিশ্বাস ও জাতির আধ্যাত্মিক পরিচয়ের রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। পবিত্র নগরীতে বিদায় অনুষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য পরে তাঁর কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা হবে।
ভোরের আকাশ/এম