প্রকৃতি রক্ষায় ১ ডলারের বিপরীতে ধ্বংসে ব্যয় ৩০ ডলার : গুতেরেস

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃতির ক্ষতি বা ধ্বংস করে এমন কর্মকাণ্ডে ৩০ ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। সম্প্রতি আর্মেনিয়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আসন্ন জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের প্রাক্কালে তিনি এই মন্তব্য করেন
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের ১৭তম সদস্য সম্মেলন (কপ-১৭)-এর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
সম্মেলন আয়োজনের জন্য আর্মেনিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, জীববৈচিত্র্য মানুষের জীবনধারণের ভিত্তি। খাদ্য, পানি ও বিশুদ্ধ বাতাসের জোগান আসে প্রকৃতি থেকে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বহিরাগত আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার, অতিরিক্ত পশুচারণ, অতিরিক্ত মাছ আহরণ ও দূষণ প্রকৃতির ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। এতে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে।
গুতেরেস বলেন, এখন ১০ লাখের বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে আমরা ক্রমেই এমন এক পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের বসবাস কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে গৃহীত কুনমিং-মন্ট্রিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। তবে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে আরও অনেক বেশি উদ্যোগ প্রয়োজন।
গুতেরেস বলেন, ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সময়ের অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। ইয়েরেভান হলো আমাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মুহূর্ত। দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, তা মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যদেশ জাতীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অর্ধেকের বেশি দেশ এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করেছে।
২০২২ সালের পর থেকে অতিরিক্ত ১৩ লাখ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ এবং ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত এলাকার আওতায় এসেছে। তবে অগ্রগতি সব জায়গায় সমান নয় এবং তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
বর্তমান জাতীয় অঙ্গীকারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মাত্র ২৬ শতাংশ স্থলজ বাস্তুতন্ত্র এবং ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক লক্ষ্য হলো ওই সময়ের মধ্যে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ করা।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থায়নের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস। তিনি বলেন, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোয় বছরে ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলার অর্থায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে অর্থায়ন এখনও তার চেয়ে অনেক কম।
জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় থামাতে করণীয় তুলে ধরে গুতেরেস তিনটি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব জোরদারের আহ্বান জানান। এগুলো হলো সরকারি উদ্যোগ, অর্থায়ন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ।
সরকারি নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি দেশগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগ ও সমুদ্রের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে এমন নীতি থেকে সরে আসা, বৃত্তাকার অর্থনীতি ও টেকসই কৃষির প্রসার, পরিবেশগত নজরদারি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান আইন কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
কপ-১৭ সম্মেলনে গৃহীত ইয়েরেভান ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এই ঘোষণা সম্মেলনকে পৃথিবী রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি নীতি, বাজেট ও বিধিবিধানের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থায়নের বিষয়ে গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থের প্রবাহ এখনও প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের পক্ষে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা প্রতি এক ডলারের বিপরীতে প্রকৃতি ধ্বংস করতে ব্যয় হচ্ছে ৩০ ডলার।’ তাঁর উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার প্রবাহিত হয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানিসহ প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন খাতে ভর্তুকি বন্ধ করে সরকারি অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে ব্যয় করার জন্য সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গুতেরেসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু মোকাবিলা ও ভূমি পুনরুদ্ধারের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বার্ষিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৫৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু সরকারের পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবদান রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ‘ক্যালি ফান্ড’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি। এই তহবিলের উদ্দেশ্য হলো, জিনগত সম্পদ ও সেগুলোর ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য থেকে সুবিধা পাওয়া কোম্পানিগুলো যেন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং এর টেকসই ব্যবহারে অবদান রাখে, তা নিশ্চিত করা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনও বিপুল ঋণের বোঝা, সীমিত সরকারি সম্পদ এবং বৈষম্যমূলক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার চাপে রয়েছে। ফলে এসব দেশকে প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানো, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জানান গুতেরেস। তার মতে, এসব সংস্কারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও শক্তিশালী ভূমিকা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণকে জীববৈচিত্র্য রক্ষার তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন গুতেরেস। বিশেষ করে তরুণ, নাগরিক সমাজ, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, পরিবেশগত অবক্ষয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব যেসব জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে, তাদের কাছেই প্রায়ই প্রকৃতি সংরক্ষণের কার্যকর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কেন্দ্রে আদিবাসী জ্ঞানকে স্থান দিয়ে আমরা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এআই—অ্যানসেস্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স বা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান—কাজে লাগাতে পারি।
হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যগত চর্চা ও জ্ঞান মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের সময়ের কথা স্মরণ করেন গুতেরেস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ পরস্পর সম্পর্কিত সংকট। এগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
গুতেরেস বলেন, আমাদেরও প্রকৃতির পরিচর্যাকারী হতে হবে। তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের সন্তানদের জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এবং পৃথিবীর সব প্রাণের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভোরের আকাশ/আ.র