বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানকেই জিজ্ঞাসা করুন: জাতিসংঘে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে বালেন্দ্র শাহ

তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সময়মতো পৌঁছায়। সীমান্ত পেরিয়ে সব জটিলতা ও বাধা দূর করে যথাসময়ে পার হয় রাইফেল ও গোলাবারুদ। কিন্তু প্রয়োজনের সময় নেপালের একজন কৃষক বাজারমূল্যে তার সার বা জ্বালানিটুকু সংগ্রহ করতে পারেন না।’
অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নির্বিঘ্নে সময়মতো পৌঁছে গেলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও কৃষিতে সার সরবরাহ আটকে থাকে—এমন প্রশ্ন তুলে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে তিনি খাদ্যের লজিস্টিকস ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং জলবায়ু সুবিচারের তাগিদ তুলে ধরেন।
চলতি বছরের অধিবেশনে সবচেয়ে কম বয়সী (৩৬ বছর) সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সময়মতো পৌঁছায়। সীমান্ত পেরিয়ে সব জটিলতা ও বাধা দূর করে যথাসময়ে পার হয় রাইফেল ও গোলাবারুদ। কিন্তু প্রয়োজনের সময় নেপালের একজন কৃষক বাজারমূল্যে তার সার বা জ্বালানিটুকু সংগ্রহ করতে পারেন না।'
তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'আমরা যুদ্ধের জন্য নিখুঁত এবং খাদ্যের জন্য একটি অকার্যকর লজিস্টিকসের বিশ্ব তৈরি করেছি।'
দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর একই ধরনের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'এটি কেবল নেপালের একক দুর্দশা নয়। আপনি বাংলাদেশকে জিজ্ঞাসা করুন, ভুটানকে জিজ্ঞাসা করুন, ভারতকে জিজ্ঞাসা করুন, মালদ্বীপকে জিজ্ঞাসা করুন, পাকিস্তানকে জিজ্ঞাসা করুন, শ্রীলঙ্কাকে জিজ্ঞাসা করুন। কিংবা আমাদের অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশকে জিজ্ঞাসা করুন—সবার মুখেই একই বিবরণ শুনবেন: যে জলবায়ু উষ্ণায়নের জন্য আমরা দায়ী নই, সেই জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে; আর যে যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি, সেই যুদ্ধের প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়ছে। এতেই বোঝা যায়, বর্তমান বৈশ্বিক সহযোগিতার কাঠামোতে বাইরে থেকে যতটা দেখা যায়, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি গলদ ও ত্রুটি রয়েছে।'
ভাষণে উঠে আসে গত ২৬ আগস্ট নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভোটেকোশি নদীতে বন্যার ট্র্যাজেডি। ওই প্রলয়ঙ্করি বন্যায় ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং নিখোঁজ হন হাজার হাজার মানুষ। শাহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক সংকটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন এবং বিশ্বনেতাদের বাস্তবতা অনুধাবন করার আহ্বান জানান।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দ্রুত নেপালের প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী একটি বিশেষ আঞ্চলিক কাঠামোর প্রস্তাব রাখেন। তিনি জানান, নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ নেতৃত্বে একটি 'হিমালয় জলবায়ু রেজিলিয়েন্স মেকানিজম' গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বালেন শাহ বলেন, 'হিন্দু কুশ হিমালয় এলাকাটি প্রায় দুইশত কোটি মানুষের বাসস্থান। এই পর্বতমালা নেপালের সীমানা পেরিয়ে বহু দূরের জনগোষ্ঠীর পানি, জলবায়ু, কৃষি ও জীবিকার জোগান নিশ্চিত করে। হিমালয় পৃথিবীর মূল কাঠামোর বাইরে কিছু নয়, এটি পৃথিবীর প্রাণরক্ষা ব্যবস্থারই একটি অংশ।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'জরুরি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমরা প্রস্তাব করছি নেপাল, ভারত ও চীনের নেতৃত্বে 'হিমালয় জলবায়ু রেজিলিয়েন্স মেকানিজম' চালু করা হোক। এই ব্যবস্থার অধীনে দেশগুলো একে অপরের সাথে উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ডাটা বা তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান করতে পারবে।'
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, জলবায়ু পরিবর্তন সীমান্ত কিংবা রাজনৈতিক মানচিত্র মানে না। হিমবাহ গলে আসা পানির ঢল কিংবা বন্যা কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা দেখে চলাচল করে না।
ভাষণের শেষাংশে বালেন শাহ বন্যা ও ভূমিধ্বসের পর যেসব দেশ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও চীন তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়া অন্যান্য বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র, জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ বিপদের দিনে নেপালের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।'
ভোরের আকাশ/এনএস