এমবাপে-দেম্বেলেদের নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্নে ফ্রান্স

গত তিন দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ফ্রান্স। শেষ সাতটি বিশ্বকাপের চারটিতে ফাইনাল খেলে ‘লে ব্লু’রা আধুনিক ফুটবলে ধারাবাহিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এবার তাদের সামনে রয়েছে দুটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শের সুযোগ।
ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের সামনে রয়েছে কিংবদন্তি ইতালিয়ান কোচ ভিত্তোরিও পোজোর পর ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ার সুযোগ। পাশাপাশি পশ্চিম জার্মানি ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার রেকর্ডও গড়তে পারে ফ্রান্স।
১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাওয়া দেশম ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব। আগামী জুলাইয়ে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে এবং দীর্ঘ ১৪ বছরের গৌরবময় কোচিং অধ্যায়েরও ইতি ঘটবে। তার উত্তরসূরি হিসেবে জিনেদিন জিদানের নাম আলোচনায় রয়েছে।
যদিও ইউরো ২০২৪-এ ফ্রান্সের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না। ওপেন প্লে থেকে দলটি মাত্র তিনটি গোল করেছিল, যার মধ্যে দুটি ছিল আত্মঘাতী। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশম এবার দলকে নতুন ছকে সাজিয়েছেন। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা ও কিলিয়ান এমবাপেদের নিয়ে ফ্রান্স এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং ভয়ংকর স্কোয়াডগুলোর একটি।
১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া ফ্রান্স এবার তাদের তৃতীয় শিরোপার লক্ষ্যে মাঠে নামবে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে নাটকীয় পরাজয়ের স্মৃতি ভুলে উত্তর আমেরিকায় নতুন ইতিহাস গড়তে চায় তারা।
ফ্রান্সের কোচ: দিদিয়ের দেশম
ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে দিদিয়ের দেশম এক অনন্য নাম। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক হিসেবে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নও করেছেন।
২০১৪ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার পর চার বছর পরই তিনি দলকে বিশ্ব ফুটবলের শিখরে পৌঁছে দেন। এর মাধ্যমে তিনি ব্রাজিলের মারিও জাগালো এবং জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপজয়ী হওয়ার বিরল কীর্তিতে নাম লেখান।
২০২২ সালে রানার্স-আপ হওয়ার পর এবার দেশমের সামনে সুযোগ রয়েছে প্রথম কোচ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে দলকে তোলার। একই সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নও বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সূচি
১৬ জুন: ফ্রান্স বনাম সেনেগাল (নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি)
২২ জুন: ফ্রান্স বনাম ইরাক (ফিলাডেলফিয়া)
২৬ জুন: নরওয়ে বনাম ফ্রান্স (বোস্টন)
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
সেরা সাফল্য: চ্যাম্পিয়ন (১৯৯৮, ২০১৮)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (রানার্স-আপ)
প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০
অংশগ্রহণ: ১৭ বার
টানা অংশগ্রহণ: ৮ বার
বিশ্বকাপ আয়োজন: ১৯৩৮, ১৯৯৮
সামগ্রিক রেকর্ড: ৭৩ ম্যাচে ৩৯ জয়, ১৪ ড্র ও ২০ হার
গোল করেছে: ১৩৬
গোল হজম করেছে: ৮৫
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৩
ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ফ্রান্স। দীর্ঘ ১৩ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে তারা উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোকে ৪-১ গোলে হারায়। সেই ম্যাচেই লুসিয়েন লরেন্ট বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে পরবর্তী দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও চিলির কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় ফরাসিদের। তবুও বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়ের অংশ হয়ে ইতিহাসে নিজেদের নাম লিখিয়ে রেখেছিল তারা।
ফ্রান্সের শেষ বিশ্বকাপ
কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের যাত্রা ছিল নাটকীয়তায় ভরা। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট—সব জায়গাতেই তারা ছিল দুর্দান্ত। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে শিরোপা ধরে রাখার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল দেশমের দল।
ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপের অসাধারণ হ্যাটট্রিকও শেষ পর্যন্ত শিরোপা এনে দিতে পারেনি। ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে রানার্স-আপ হয় ফ্রান্স। এমবাপে আট গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলেও সেটি ছিল তাদের জন্য সামান্য সান্ত্বনা।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ গোলদাতা
ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে মাত্র ছয় ম্যাচে ১৩ গোল করে ইতিহাস গড়েছিলেন। আজও একক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি তার দখলে রয়েছে।
অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপে ইতোমধ্যে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে মিলিয়ে ১২ গোল করেছেন। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফন্টেইনকে ছাড়িয়ে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে সবচেয়ে বেশি ২০ ম্যাচ খেলেছেন সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হুগো লরিস। ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে ফরাসি গোলপোস্ট সামলানো এই তারকা ২০১৮ সালে দলকে বিশ্বকাপ জেতান।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া লরিসের রেকর্ড ভাঙার পথে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে। ফ্রান্স যদি ২০২৬ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল বা তারও বেশি দূর যেতে পারে এবং এমবাপে সব ম্যাচ খেলেন, তাহলে এই রেকর্ড তার দখলে চলে যেতে পারে।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় জয়
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় জয় চার গোলের ব্যবধানে। ১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৭-৩ গোলের জয় তাদের সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ডও। এছাড়া একই আসরে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে ৪-০ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে একই ব্যবধানে হারিয়েছিল ফ্রান্স।
ফ্রান্সের সম্ভাব্য স্কোয়াড
গোলরক্ষক: মাইক মেনিয়ান, রবিন রিসার, ব্রিস সাম্বা।
ডিফেন্ডার: লুকাস দিনিয়ে, মালো গুস্তো, লুকাস হার্নান্দেজ, থিও হার্নান্দেজ, ইব্রাহিমা কোনাতে, জুল কুন্দে, ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া, উইলিয়াম সালিবা, দায়ো উপামেকানো।
মিডফিল্ডার: এন'গোলো কান্তে, মানু কোনে, আদ্রিয়েন রাবিও, অরেলিয়াঁ শুয়ামেনি, ওয়ারেন জায়েরে-এমেরি।
ফরোয়ার্ড: ম্যাগনেস আকলিউশ, ব্র্যাডলি বারকোলা, রায়ান শেরকি, উসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে, জ্যঁ-ফিলিপ মাতেতা, কিলিয়ান এমবাপে, মাইকেল ওলিসে ও মার্কাস থুরাম।
ভোরের আকাশ/সু.পা