১২৬ দিন পর টেস্টে নামছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আবার ফিরছে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে। দীর্ঘ ১২৬ দিন পর টেস্ট মাঠে নামছে টাইগাররা, প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড। ভেন্যু সেই প্রিয় সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম যেখানে একসময় শুরু হয়েছিল অধিনায়ক হিসেবে নাজমুল হোসেন শান্তর স্বপ্নযাত্রা, আর এবার সেখান থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে তার ‘দ্বিতীয় ইনিংস’। শান্তর নতুন শুরু, ব্যাটিং কোচ হিসেবে মোহাম্মদ আশরাফুলের প্রথম পরীক্ষা, আর মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলকের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
অধিনায়ক শান্তর ‘দ্বিতীয় ইনিংস’ : দেড় বছর আগে, ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিলেটেই প্রথম অধিনায়কত্ব পান শান্ত। নিয়মিত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান তখন চোটে, তাই তরুণ এই বাঁহাতির কাঁধে ওঠে নেতৃত্বের ভার। আর সেই দায়িত্বে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন প্রথম ইনিংসে ৩৭, দ্বিতীয় ইনিংসে দারুণ এক সেঞ্চুরি, আর সেই ইনিংসেই বাংলাদেশ পায় ঐতিহাসিক টেস্ট জয়। সেই জয় শান্তর নেতৃত্বকে স্থায়ী করে দেয়।
এরপর টানা ১৪ টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি ৪ জয়, ৯ হার, ১ ড্র। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ শেষে অভিমান করে অধিনায়কত্ব ছাড়েন শান্ত। কারণ ছিল স্পষ্ট হঠাৎ করে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়ায় মনের কষ্ট। কিন্তু বিসিবি তাকে হারাতে চায়নি। বোর্ড দীর্ঘ আলোচনা শেষে শান্তর অভিমান ভাঙায়, আর ফেরায় টেস্ট দলের নেতৃত্বে। নতুন করে দায়িত্ব নিয়ে শান্ত বলেছিলেন, আমি অধিনায়কত্বে ধারাবাহিকতা চাই। টেস্টে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে চাই।
এবার তাই সিলেটেই তার নতুন যাত্রা, সেই পুরোনো মঞ্চে নতুন সূচনা। এই মাঠেই একসময় তিনি লিখেছিলেন নিজের নেতৃত্বের প্রথম সাফল্যের গল্প, এবার দেখার বিষয় এই মঞ্চেই কি আবার শুরু হয় শান্তর অধিনায়কত্বের ‘রিটার্ন টু গ্লোরি’?
নতুন কোচ, পুরোনো চেনা মুখ আশরাফুলের প্রথম পরীক্ষা : সিলেট টেস্ট দিয়ে আরেকজনেরও নতুন শুরু হচ্ছে ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক সময়ের পোস্টারবয়, প্রতিভার প্রতীক, এখন নতুন দায়িত্বে ফের ক্রিকেটের ড্রেসিংরুমে। সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আশরাফুলের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব।
এনসিএল, বিপিএল, প্রিমিয়ার লিগে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও জাতীয় দলে এটাই তার প্রথমবার। তবে কাজটা সহজ নয়। অতীতে ডেভিড হ্যাম্প বা নেইল ম্যাকেঞ্জির মতো অভিজ্ঞ ব্যাটিং কোচরা থেকেও ধারাবাহিকতা আনতে পারেননি। তাই দায়িত্বের প্রথম দিন থেকেই চাপ থাকবে আশরাফুলের ওপর বিশেষ করে শান্ত, মুমিনুল, মুশফিকদের মতো ব্যাটারদের দীর্ঘ ইনিংস খেলতে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে। আশরাফুল নিজেই বলেছেন, টাইগারদের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তায়। আমি চাই ব্যাটসম্যানরা যেন সেশনের পর সেশন ধরে খেলতে শেখে।
৯৯ নটআউট মুশফিক ইতিহাসের সামনে : বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যানদের একজন মুশফিকুর রহিম। আজ শুরু হতে যাওয়া সিলেট টেস্টটি হবে তার ৯৯তম টেস্ট ম্যাচ। আর এর পরের ম্যাচ, ঢাকায় সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট, হতে যাচ্ছে তার শততম টেস্ট । প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি গড়বেন তিনি।
মুশফিক সামাজিক মাধ্যমে নিজের টেস্ট ক্যাপ ও ব্যাটের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, সকল উত্থান-পতনের সাক্ষী আমি। এই বার্তাই যেন লুকিয়ে আছে তার দুই দশকের লাল বলের লড়াই। শততম টেস্টের আগে তিনি ফর্মেও আছেন দারুণ এনসিএলের দ্বিতীয় রাউন্ডে করেছেন এক ঝলমলে সেঞ্চুরি। ফলে সিলেটে তার ৯৯তম ম্যাচটা হতে পারে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক পদক্ষেপ, ইতিহাস ছোঁয়ার আগে শেষ দৌড়।
প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড চ্যালেঞ্জে ভরা প্রত্যাবর্তন : বাংলাদেশ যেমন প্রায় পাঁচ মাস পর টেস্ট খেলতে নামছে, তেমনি আয়ারল্যান্ডও ফিরছে দীর্ঘ বিরতির পর লাল বলের ক্রিকেটে। তাদের স্কোয়াডে রয়েছেন অভিজ্ঞ অ্যান্ডি বালবার্নি, পল স্টার্লিং, হ্যারি টেক্টরের মতো ক্রিকেটাররা। তবে দলে চারজন নবাগতও আছেন তাদের মধ্যে কেড কারমাইকেল, স্টিফেন ডোহেনি, জর্ডান নিয়েল ও লিয়াম ম্যাকার্থি প্রথমবারের মতো টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন।
আইরিশদের সবচেয়ে বড় ভরসা হবেন অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন, যিনি টেস্টে দলের হয়ে ৫০০ রানের পাশাপাশি ২৫ উইকেট নেওয়া একমাত্র ক্রিকেটার। সিলেটেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ছয় উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এবারও তাকেই কেন্দ্র করে গড়তে চায় পরিকল্পনা। তবে সিলেটের উইকেট স্পিন-বান্ধব হলে বাংলাদেশের সুবিধাই বেশি থাকবে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদি হাসান মিরাজের যুগল স্পিন আক্রমণেই থাকবে আস্থা। সঙ্গে ফাস্ট বোলার এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদের বাউন্সের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে আইরিশদের।
মাঠ, পরিবেশ ও প্রত্যাশা : সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যারা প্রথমে ব্যাট করেছে, তাদের গড় রান ২৬৬ যা এই ভেন্যুতে জয় পেতে যথেষ্ট হয়েছে বেশিরভাগ সময়েই। রোদেলা আবহাওয়া, বিকেলে হালকা ঠান্ডা হাওয়া আদর্শ টেস্ট পরিবেশই অপেক্ষা করছে দুই দলের জন্য। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে এখন রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণে, অভিজ্ঞদের সঙ্গে নতুনদের সমন্বয়ে এগিয়ে যেতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। শান্তর জন্য এটি নেতৃত্বের পুনর্জন্ম, আশরাফুলের জন্য প্রমাণের সময়, আর মুশফিকের জন্য ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড়ানো এক আবেগঘন অধ্যায়।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ
শাদমান ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (উইকেটকিপার), মেহেদি হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, হাসান মুরাদ, এবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ।
আয়ারল্যান্ড সম্ভাব্য একাদশ
অ্যান্ডি বালবির্নি (অধিনায়ক), স্টিফেন ডোহেনি/কেড কারমাইকেল, কার্টিস ক্যাম্পার, হ্যারি টেক্টর, পল স্টার্লিং, লরকান টাকার (উইকেটরক্ষক), অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন, ব্যারি ম্যাকার্থি, ম্যাথিউ হামফ্রেস, ক্রেইগ ইয়াং, গ্রাহাম হিউম
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আয়ারল্যান্ড দলে কয়েকজন আনক্যাপড বা নতুন খেলোয়াড় রয়েছে, তাই তাদের একাদশে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ